
একদিকে দেশের কৃষক সারের জন্য ডিলারের দোকানে ঘুরছেন। কোথাও নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দিয়েও মিলছে না প্রয়োজনীয় সার। কোথাও সার না পেয়ে ক্ষুব্ধ কৃষকের বিক্ষোভ, কোথাও গুদাম ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটছে। অন্যদিকে সীমান্তের অন্ধকার পথে, নদী ও সাগরপথে দেশের ভর্তুকি দেওয়া সার পৌঁছে যাচ্ছে মিয়ানমারে।
অভিযোগ রয়েছে, বাংলাদেশের তুলনামূলক কম দামের সার পাচার করে মিয়ানমারে নিয়ে যাচ্ছে সংঘবদ্ধ একটি চক্র। বিনিময়ে দেশে ঢুকছে ইয়াবা, আইসসহ বিভিন্ন মাদক এবং আগ্নেয়াস্ত্র। চক্রটির সঙ্গে সীমান্তের চিহ্নিত মাদক ও মানবপাচারকারীদের পাশাপাশি অসাধু সার ডিলার, পরিবহন ব্যবসায়ী, নৌকার মাঝি, কৃষক এবং স্থানীয় দালালদের একটি অংশ জড়িয়ে পড়েছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
কক্সবাজারের টেকনাফ-উখিয়া থেকে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি, আর দেশের অন্য প্রান্তে কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, যশোর ও সাতক্ষীরা সীমান্ত পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে সারের অবৈধ বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা সংস্থার সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেশের সার সংকটের কারণ হিসেবে সীমান্ত দিয়ে সার পাচারের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরে দেওয়া ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারি ভর্তুকির কারণে বাংলাদেশে সারের দাম ভারতের তুলনায় কম। এই মূল্য ব্যবধানকে কাজে লাগিয়ে অসাধু ডিলার ও সার পরিবহন ব্যবসায়ীদের যোগসাজশে বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে সার পাচার হচ্ছে।
প্রতিবেদনে কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, যশোর ও সাতক্ষীরা সীমান্তের পাশাপাশি চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক, কর্ণফুলী নদীর মোহনা এবং কক্সবাজারের বিভিন্ন উপকূলীয় এলাকা দিয়ে মিয়ানমারে সার পাচারের তথ্য উঠে এসেছে।
বিজিবি ও কোস্ট গার্ডের তথ্য বলছে, চলতি বছরের জুন থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কক্সবাজার ও বান্দরবান সীমান্তে অভিযান চালিয়ে ২ লাখ ৩৫ হাজার ৯০৮ কেজি সার জব্দ করা হয়েছে। এসব ঘটনায় ১১৭ জনকে আটক করে মামলা করেছে সংশ্লিষ্ট বাহিনী।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের ভাষ্যেই উঠে এসেছে পাচারকারীদের কৌশল। অভিযানে অধিকাংশ সময় সার বহনকারী শ্রমিক, মাঝি কিংবা ভাড়াটে লোকজন ধরা পড়লেও নেপথ্যের অর্থদাতা ও মূল হোতাদের অনেকেই থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।
কোস্ট গার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লে. কমান্ডার বিএন সাব্বির আলম সুজন বলেন, অভিযানে আটক ব্যক্তিদের অধিকাংশই শ্রমিক। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে মামলায় মূলহোতাদের আসামি করার চেষ্টা করা হয়। এরপর তদন্তের মাধ্যমে সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি বের করার দায়িত্ব তদন্তকারী সংস্থার।
টেকনাফ-২ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল আশিকুর রহমান বলেন, হাতেনাতে আটক ব্যক্তিদের পাশাপাশি গোয়েন্দা তথ্য ও প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্টদেরও মামলায় আসামি করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, বাংলাদেশে সরকার নির্ধারিত দামে এক বস্তা ইউরিয়া সারের মূল্য প্রায় ১ হাজার ৩৫০ টাকা। অথচ পাচার হয়ে মিয়ানমারে পৌঁছানোর পর সেই একই বস্তা সার বিক্রি হচ্ছে প্রায় ৮ হাজার টাকা দরে। এই বিপুল মূল্য ব্যবধানই পাচারকারীদের কাছে সারকে লাভজনক পণ্যে পরিণত করেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মিয়ানমারের রাখাইন অঞ্চলে সারের সংকট এবং বাংলাদেশের তুলনামূলক কম দাম পাচারকারীদের জন্য তৈরি করেছে বড় বাজার। ফলে মাদক, অস্ত্র কিংবা মানবপাচারের পুরোনো রুটগুলোতেই যুক্ত হয়েছে সার পাচারের নতুন ব্যবসা।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও মিয়ানমারের সিটওয়েতে বাংলাদেশের সাবেক কনস্যুলেট প্রধান অবসরপ্রাপ্ত মেজর এমদাদুল ইসলাম বলেন, রাখাইন রাজ্যের অধিকাংশ এলাকা এখন আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে। জান্তা সরকার ওই অঞ্চলে সার সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়ায় সেখানে সারের চাহিদা তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগাচ্ছে চোরাকারবারিরা।
তার ভাষ্য, আরাকান আর্মি সমঝোতার পাশাপাশি চোরাই পথেও সার সংগ্রহের চেষ্টা করছে বলে তথ্য রয়েছে। কক্সবাজারে সারের সংকট নিয়ে প্রশ্ন উঠছে সরকারি বরাদ্দ ব্যবস্থাপনাতেও।
জেলা প্রশাসন, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, চলতি মাসে জেলার জন্য ইউরিয়ার চাহিদা নির্ধারণ করা হয়েছিল ১ হাজার ৮৪৩ টন। এর বিপরীতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ২ হাজার ৩৪৩ টন। টিএসপির চাহিদা ছিল ৪৭৫ টন। ডিএপির চাহিদা ৭৮৯ টনের বিপরীতে বরাদ্দ ৮৮৯ টন এবং এমওপির বরাদ্দ ৩৬৮ টন। অর্থাৎ কিছু ক্ষেত্রে চাহিদার চেয়েও বেশি সার বরাদ্দ দেওয়ার পরও সীমান্তবর্তী এলাকার প্রান্তিক কৃষকদের অনেকেই প্রয়োজনীয় সার পাচ্ছেন না।
হোয়াইক্যং ইউনিয়নের কৃষক সাইফুদ্দিন মোবারক বলেন, সারের জন্য একাধিক ডিলারের কাছে ঘুরেও তিনি পর্যাপ্ত সার পাননি। তার অভিযোগ, সীমান্তবর্তী এলাকায় প্রতিদিন বিভিন্ন পণ্য পাচার হলেও তা বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা দেখা যাচ্ছে না।
টেকনাফ সদর ইউনিয়নের কচুবনিয়ার কার্ডধারী কৃষক আবদুল গফুরের অভিযোগ, জমি বেশি এমন কৃষকরাই বেশি সমস্যায় পড়ছেন। তার দাবি, কৃষক নন এমন লোকজনের কাছেও খুচরা সার বিক্রি করা হচ্ছে। পরে সেই সার মজুদ করে পাচারের জন্য দেওয়া হচ্ছে।
অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সার পাচারের জন্য নতুন কোনো অবকাঠামো তৈরি করতে হয়নি পাচারকারীদের। দীর্ঘদিন ধরে ইয়াবা, আইস, অস্ত্র ও মানবপাচারে ব্যবহৃত সীমান্ত ও উপকূলীয় রুটগুলোকেই ব্যবহার করা হচ্ছে।
উখিয়া ও টেকনাফের অন্তত ১৫টি পয়েন্ট দিয়ে সার পাচারের অভিযোগ রয়েছে। উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের আনজুমানপাড়া এর মধ্যে অন্যতম বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
টেকনাফের হোয়াইক্যংয়ের উলুবনিয়া, হারাইঙ্গাঘোনা, ঝিমংখালী, কানজরপাড়া, তুলাতলি, কোনারপাড়া ও আমতলী; হ্নীলার লেদা, দমদমিয়া খাল, হ্নীলা বাজার, স্টেশন ও রঙ্গিখালী এলাকাও পাচারের রুট হিসেবে স্থানীয়দের কাছে পরিচিত। এর বাইরে নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী বিভিন্ন এলাকাও ব্যবহার হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
উখিয়া ৬৪ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, স্থলপথে নজরদারি বাড়ানোয় পাচারকারীরা জলপথ ব্যবহার করছে।
সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য ও স্থানীয় পর্যায়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে পাচার ব্যবস্থায় অন্তত তিন ধরনের লোকের সম্পৃক্ততার কথা উঠে এসেছে।
প্রথম স্তরে রয়েছে সার সংগ্রহ ও সরবরাহের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা। এর মধ্যে অসাধু ডিলার, কার্ডধারী কৃষক কিংবা তাদের মাধ্যমে সার সংগ্রহকারী স্থানীয় দালাল থাকতে পারে। দ্বিতীয় স্তরে রয়েছে পরিবহনকারী ও বহনকারীরা। নৌকার মাঝি, শ্রমিক, সীমান্তবর্তী কৃষক, রাখাল কিংবা অর্থের বিনিময়ে কাজ করা স্থানীয় লোকজনকে ব্যবহার করা হয় বলে অভিযোগ। আর তৃতীয় স্তরে রয়েছে অর্থদাতা ও নেপথ্যের কারবারিরা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এই স্তরের সঙ্গে মাদক ও মানবপাচারে জড়িত পুরোনো চক্রের সদস্যদের যোগসূত্র রয়েছে।
টেকনাফের হোয়াইক্যংয়ের আইনজীবী শাহীন শাহ বলেন, সীমান্ত এলাকায় সার পাচারে কয়েকটি গ্রুপ সক্রিয়। তার দাবি, ছোটখাটো মাদক কারবারিদের পাশাপাশি কিছু ডিলার ও কৃষকও টাকার বিনিময়ে সার তুলে দিচ্ছেন। আর বড় মাদক ও মানবপাচারকারীরা অনেক ক্ষেত্রে এসব কাজে অর্থ বিনিয়োগ করছে।
স্থানীয়দের সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ হলো, সার পাচারকে কেবল আলাদা একটি চোরাচালান হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি বোঝা যাবে না।
তাদের দাবি, মিয়ানমারের সঙ্গে পণ্য বিনিময়ের এই অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্যের সঙ্গে মাদক পাচারের যোগসূত্র রয়েছে। বাংলাদেশ থেকে সার বা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য নেওয়ার পর বিপরীতে মিয়ানমার থেকে ইয়াবা, আইস কিংবা অস্ত্রের চালান ঢোকার অভিযোগ রয়েছে।
পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, সার পাচারের সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের অনেকেই ইয়াবা ও আইসসহ বিভিন্ন মাদক পাচারের সঙ্গেও জড়িত বলে স্থানীয়ভাবে অভিযোগ রয়েছে।
কৃষি বিভাগের মাঠপর্যায়ের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, পাচারকারীরা সরাসরি বড় পরিমাণ সার সংগ্রহ না করে প্রান্তিক কৃষকদের ব্যবহার করছে। কৃষকের কার্ডের মাধ্যমে সার সংগ্রহের পর তা সীমান্তবর্তী এলাকায় নিয়ে মজুদ করা হয়। পরে সুযোগ বুঝে নৌকার মাঝি, সীমান্তে কাজ করা কৃষক কিংবা রাখালদের মাধ্যমে ওপারে পাঠানো হয়। কিছু ক্ষেত্রে ডিলারদের সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগও রয়েছে বলে জানান তিনি।
টেকনাফ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. হুমায়ুন কবির বলেন, সীমান্তে বসবাসকারী মানুষ সচেতন না হলে পাচার পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন। সার বিতরণের সময় কৃষি বিভাগের কর্মকর্তা উপস্থিত থাকছেন বলেও জানান তিনি।
তার ভাষ্য, সীমান্তে মাদক, অস্ত্র ও মানবপাচারের সঙ্গে যারা জড়িত, তারাই সার পাচারের সঙ্গেও জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।
উখিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কামনাশিস সরকার বলেন, সার পাচার বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কৃষকদের সার দেওয়ার সময় বস্তা খুলে দেওয়ার পাশাপাশি পাচারের অভিযোগে উখিয়ায় ১২টি মামলা করা হয়েছে। এর মধ্যে দুজন ডিলারের নামেও মামলা রয়েছে।
জেলা প্রশাসন ও কৃষি বিভাগের মাঠপর্যায়ের তদন্তে সীমান্তবর্তী এলাকার প্রায় ১০ থেকে ১২ জন ডিলারের বিরুদ্ধে সার পাচার, অতিরিক্ত দাম নেওয়া ও অন্যান্য অনিয়মের অভিযোগ পাওয়ার কথা জানা গেছে। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশও করা হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কক্সবাজার কার্যালয়ের উপপরিচালক ড. বিমল কুমার প্রামাণিক বলেন, নানা অনিয়মে জড়িত কয়েকজন ডিলারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর অনিয়মে জড়িত ডিলারদের নিয়ে কালো তালিকাও করেছে। সেখানে কক্সবাজারের কয়েকজনের নাম রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
টেকনাফ থানার ওসি সাইফুল ইসলাম বলেন, সার পাচারের ঘটনায় সম্প্রতি কয়েকটি মামলা হয়েছে। এসব মামলা তদন্তাধীন। তদন্ত শেষ হলে কারা এর সঙ্গে জড়িত, তা জানা যাবে।
তবে সীমান্তের বাস্তবতা বলছে, সার পাচার এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। পুরোনো মাদক ও মানবপাচারের রুটে নতুন করে যুক্ত হয়েছে ভর্তুকির সার। কৃষকের জন্য বরাদ্দ সরকারি সার যখন সীমান্ত পেরিয়ে যাচ্ছে, তখন তার বিপরীতে মাদক ও অস্ত্রের চালান ঢোকার অভিযোগ দেশের সীমান্ত নিরাপত্তা ও কৃষি ব্যবস্থাপনা, দুই ক্ষেত্রেই নতুন করে প্রশ্ন তুলছে।
দেশপক্ষ/ এমএইচ









