
বাংলাদেশের রাজনীতিতে কিছু নাম থাকে যারা কেবল ক্ষমতার জন্য নয়, বরং মানুষের ভালোবাসার জন্য রাজনীতি করেন। জননেতা আহসান উল্লাহ মাস্টার ছিলেন সেই বিরল ব্যক্তিত্বদের একজন। ২০০৪ সালের ৭ মে গাজীপুরের এক জনসভায় সন্ত্রাসীদের বুলেটে যখন তাঁর জীবনপ্রদীপ নিভিয়ে দেওয়া হয়, তখন স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল গোটা বাংলাদেশ। আজ তাঁর সেই বিয়োগান্তক ঘটনার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আমাদের মনে পড়ে এক আপসহীন, নির্লোভ ও জনদরদী নেতার কথা।
আহসান উল্লাহ মাস্টারের রাজনৈতিক জীবন ছিল রাজপথ থেকে উঠে আসা এক সংগ্রামী মহাকাব্য।
তাঁর রাজনীতির হাতেখড়ি ষাটের দশকের ছাত্র আন্দোলনের উত্তাল সময়ে। ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন এবং পরবর্তীতে ১৯৬৬-এর ছয় দফা আন্দোলনে একজন তরুণ ছাত্রনেতা হিসেবে তিনি রাজপথে সক্রিয় ছিলেন। ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানেও তাঁর ভূমিকা ছিল অনন্য। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করে তিনি দেশমাতৃকার স্বাধীনতায় অবদান রাখেন। স্বাধীনতার পর তিনি নিজেকে নিবেদিত করেন দেশ গড়ার কাজে এবং শ্রমিকদের ভাগ্য উন্নয়নে।
তিনি কেবল একজন রাজনীতিবিদ ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন আদর্শ শিক্ষক এবং প্রথিতযশা শ্রমিক নেতা। তৃণমূল থেকে উঠে আসা এই নেতা গাজীপুরের মাটি ও মানুষের সাথে মিশে গিয়েছিলেন। রাজনীতির পাশাপাশি তিনি টঙ্গীর নোয়াগাঁও এম এ মজিদ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে স্থানীয় শিক্ষার প্রসারে আমৃত্যু কাজ করেছেন। জাতীয় শ্রমিক লীগের কার্যকরী সভাপতি হিসেবে তিনি শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) থেকে শুরু করে রাজপথের প্রতিটি সংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। বিশেষ করে নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলকে আন্দোলনের দুর্গে পরিণত করার পেছনে তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতা ও আপসহীন নেতৃত্ব ছিল অনস্বীকার্য। ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে পরপর দুবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পরও তাঁর জীবনযাপন ছিল অত্যন্ত সাধারণ, যা বর্তমান সময়ের রাজনীতিতে এক উজ্জ্বল ও বিরল দৃষ্টান্ত। তাঁর রাজনীতি ছিল ত্যাগের, ভোগের নয়।
২০০৪ সালের সেই রক্তাক্ত বিকেলের স্মৃতি আজও আমাদের তাড়া করে ফেরে। ৭ মে শুক্রবার, টঙ্গীর নোয়াগাঁও এম এ মজিদ সরকারি হাই স্কুল মাঠে এক স্বেচ্ছাসেবক লীগের সম্মেলন চলাকালে প্রকাশ্য দিবালোকে আততায়ীরা তাঁকে ব্রাশফায়ার করে নির্মমভাবে হত্যা করে। এই হত্যাকাণ্ড কেবল একজন ব্যক্তির মৃত্যু ছিল না, বরং তা ছিল গণতন্ত্র ও প্রগতিশীল রাজনীতির ওপর এক চরম আঘাত। ঘাতকরা চেয়েছিল তাঁর কণ্ঠ স্তব্ধ করে দিয়ে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করতে, কিন্তু তারা জানত না যে আদর্শের কোনো মৃত্যু নেই।
আহসান উল্লাহ মাস্টার হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়া বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর ২০০৫ সালের ১৬ এপ্রিল দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল বিএনপি নেতা নুরুল ইসলাম সরকারসহ ২২ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ৬ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করেন। এটি ছিল দেশের ইতিহাসে কোনো হত্যাকাণ্ডে সর্বোচ্চ সংখ্যক ফাঁসির আদেশ। পরবর্তীতে দীর্ঘ শুনানি শেষে ২০১৬ সালের ১৫ জুন হাইকোর্ট মূল পরিকল্পনাকারীসহ ৬ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন এবং ৮ জনের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। বর্তমানে মামলাটি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে চূড়ান্ত নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। প্রধান আসামী কারাগারে থাকলেও দণ্ডপ্রাপ্ত কয়েকজন আসামী এখনো পলাতক। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ও রায় পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের মাধ্যমেই তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রেষ্ঠ সম্মান জানানো সম্ভব।
আহসান উল্লাহ মাস্টারের মৃত্যুর পর তাঁর সুযোগ্য পুত্র জাহিদ আহসান রাসেল পিতার আদর্শকে ধারণ করে গণমানুষের সেবা করে যাচ্ছেন। গাজীপুরের মানুষ আজও আহসান উল্লাহ মাস্টারকে তাঁদের প্রতিটি সংগ্রামে ও বিপদে-আপদে স্মরণে রাখেন। ২০২১ সালে তাঁকে মরণোত্তর ‘স্বাধীনতা পদক’ প্রদান করে রাষ্ট্র তাঁর ত্যাগকে অনন্য স্বীকৃতি দিয়েছে।
মূলত আহসান উল্লাহ মাস্টারের মতো স্বচ্ছ ভাবমূর্তির নেতার আজ বড্ড প্রয়োজন। হিংসা ও প্রতিহিংসার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে কীভাবে মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা করে নিতে হয়, তা তিনি শিখিয়ে গেছেন। তাঁর শাহাদাত বার্ষিকীতে আমাদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত—সন্ত্রাসমুক্ত এক সুস্থ ও মানবিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা। ইতিহাসের পাতায় শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার চিরকাল এক দীপ্ত নক্ষত্র হয়ে উজ্জ্বল থাকবেন।
(মানিক লাল ঘোষ: সাংবাদিক ও কলামিস্ট। ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সহ-সভাপতি)
দেশপক্ষ/ এমএইচ







