ঢাকা, শনিবার, ৯ মে ২০২৬, ৫:০৬ অপরাহ্ন

রূপপুর পরমাণু বিপ্লবের রূপকার ও নিরহংকারী নক্ষত্র ড. ওয়াজেদ মিয়া

বরণীয়, স্মরণীয় আর অনুকরণীয় মানুষের সংখ্যা বর্তমান সময়ে ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসছে। ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়া, হিংসা, বিদ্বেষ, লোভ আর আত্মঅহমিকা যখন আমাদের মনমানসিকতাকে ক্রমাগত গ্রাস করছে, তখন সমাজের প্রচলিত ধারার বিপরীতে এক নির্লোভ ও নিরহংকারী মানুষের প্রতিচ্ছবি ছিলেন বরেণ্য পরমাণু বিজ্ঞানী ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া। ক্ষমতার খুব কাছাকাছি থেকেও তিনি ছিলেন অতি সাধারণ এক মানুষ। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জামাতা এবং প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনার স্বামী হওয়া সত্ত্বেও তিনি কখনোই ক্ষমতার মোহ বা প্রভাব ব্যবহার করেননি। বরং আজীবন নিভৃতে থেকে দেশ ও জাতির কল্যাণে কাজ করে গেছেন।

​ড. ওয়াজেদ মিয়ার বিজ্ঞান চর্চা ও দেশপ্রেমের সবচেয়ে বড় স্মারক হয়ে থাকবে বাংলাদেশের ‘রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র’ প্রকল্প। আজ রূপপুর আমাদের কাছে কোনো স্বপ্ন নয়, বরং এক দৃশ্যমান বাস্তবতা। এই প্রকল্পের পুনরুজ্জীবন এবং পরমাণু বিপ্লবের মাধ্যমে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় তার অবদান অনস্বীকার্য। ১৯৯৭ সালে আণবিক শক্তি কমিশনের চেয়ারম্যান থাকাকালীন তিনি এই থমকে যাওয়া প্রকল্পটিকে নতুন করে সচল করার কারিগরি ও প্রশাসনিক উদ্যোগ নিয়েছিলেন। একজন দূরদর্শী বিজ্ঞানী হিসেবে তিনি অনুধাবন করেছিলেন যে, উন্নত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে পারমাণবিক শক্তির বিকল্প নেই। তার সেই নীরব ও নিরলস প্রচেষ্টার ফলেই আজ বাংলাদেশ বিশ্বের ‘নিউক্লিয়ার ক্লাব’-এর সদস্য হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে।

​১৯৪২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি রংপুরের পীরগঞ্জের ফতেহপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করা এই বিজ্ঞানী নিজের মেধা দিয়ে বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশকে গর্বিত করেছেন। রংপুর জিলা স্কুল ও রাজশাহী কলেজের গণ্ডি পেরিয়ে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিজ্ঞানে এমএসসি এবং লন্ডনের ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন। মেধার চর্চায় যেমন নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন, তেমনি ছাত্রজীবন থেকেই ছিলেন রাজনৈতিকভাবে সচেতন। ছাত্রলীগের মনোনয়নে তিনি ফজলুল হক হলের ভিপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর স্নেহধন্য এই মানুষটি ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর চরম ঘাত-প্রতিঘাতের শিকার হন। স্ত্রী শেখ হাসিনা ও সন্তানদের নিয়ে জার্মানিতে নির্বাসিত জীবনে নানা প্রতিকূলতার মাঝেও তিনি বিজ্ঞান চর্চা থেকে বিচ্যুত হননি। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনেও তার সাহসী কারাবরণের ইতিহাস আমাদের অনুপ্রেরণা দেয়।

​বিজ্ঞানের পাশাপাশি লেখক হিসেবেও ড. ওয়াজেদ মিয়া গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে গেছেন। তার লেখা বিজ্ঞানভিত্তিক গ্রন্থগুলো আজ বিশ্বের বিভিন্ন নামী বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্যবই হিসেবে পড়ানো হচ্ছে। এ ছাড়া বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে ঘিরে কিছু ঘটনা এবং বাংলাদেশের রাজনীতি ও সরকারের চালচিত্র নিয়ে তার লেখা গ্রন্থগুলো ইতিহাসের মূল্যবান দলিল। তার এই চারিত্রিক সততা, দেশপ্রেম আর নির্লোভ থাকার শিক্ষা প্রতিফলিত হয়েছে তার সন্তানদের মাঝেও। ডিজিটাল বাংলাদেশের রূপকার সজীব ওয়াজেদ জয় এবং আন্তর্জাতিক অটিজম বিশেষজ্ঞ সায়মা ওয়াজেদ পুতুল আজ নিজ নিজ ক্ষেত্রে বিশ্বজুড়ে সমাদৃত, যা মূলত ড. ওয়াজেদ মিয়ারই পারিবারিক শিক্ষার ফসল।

​২০০৯ সালের ৯ মে এই মহান কর্মবীরের জীবনাবসান ঘটে। নিজের শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী পীরগঞ্জের নিভৃত পল্লীতে বাবা-মায়ের কবরের পাশেই তাকে সমাহিত করা হয়। দেশের পরমাণু বিজ্ঞানের জয়যাত্রায় এবং একটি আদর্শবাদী জীবন গঠনে ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়ার জীবনাদর্শ আগামী প্রজন্মের কাছে চিরকাল অনুকরণীয় হয়ে থাকবে।

​( মানিক লাল ঘোষ : সাংবাদিক ও কলামিস্ট। সাবেক সহ-সভাপতি, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন -ডিইউজে )

দেশপক্ষ/ এমএইচ

নিউজটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

ট্যাগঃ