ঢাকা, শনিবার, ২৩ মে ২০২৬, ২:০৩ পূর্বাহ্ন

‘আমি কখনো হারি না, হয় জিতি, নয়তো শিখি’

এমিলিয়ানো মার্তিনেস

‘আমি কখনো হারি না, হয় জিতি, নয়তো শিখি’- গত নভেম্বরে লিভারপুরের বিপক্ষে শিশুতোষ ভুলে গোল হজমের পর এভাবেই বলেছিলেন এমিলিয়ানো মার্তিনেস। এটাই যেন জানিয়ে দেয়, মার্তিনেসের মানসিকতা কতটা লড়াকু, কতটা উন্নত।

অ্যাস্টন ভিলায় খেলা আর্জেন্টাইন গোলকিপার যে যথার্থই বলেছেন, সেটা আরেকবার প্রমাণিত হয়েছে গতকাল বুধবার রাতে। জার্মান ক্লাব ফ্রেইবুর্গকে হারিয়ে ইউরোপা লিগের শিরোপা জিতেছে অ্যাস্টন ভিলা। সব ধরনের প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ৩০ বছর পর কোনো শিরোপা জিতল ইংলিশ ক্লাবটি। আর এমি মার্তিনেস যেন পা রাখলেন সপ্তম স্বর্গে!

কী অবাক হচ্ছেন? অবাক হওয়ার মতোই তো কাণ্ড ঘটিয়ে চলছেন এমি মার্তিনেস। এখন পর্যন্ত খেলা ৭ ফাইনালের একটিতেও হারেননি আর্জেন্টাইন ‘বাজপাখি’।

২০২০-এ এফএ কাপ দিয়ে শুরু, একই বছরে এফএ কমিউনিটি শিল্ড, পরের বছর আর্জেন্টিনার জার্সিতে কোপা আমেরিকা জয়, ২০২২ এ ফিনালিসিমা, এরপর কাতারে ঐতিহাসিক বিশ্বকাপ, ২০২৪-এ আরেকটা কোপা আমেরিকা, এরপর গতকালের ইউরোপা লিগের ফাইনাল- শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচ এলেই যেন রীতিমতো অতিমানব বনে যান মার্তিনেস। ফাইনালে জয় ভিন্ন অন্য কোনো শব্দ যেন লেখা নেই তাঁর ডিকশনারিতে।

অথচ এমি মার্তিনেসের উত্থানটা মোটেই সহজ ছিল না। উন্নত জীবন আর উজ্জ্বল ভবিষ্যতের আশায় ২০১০ সালে আর্সেনালে যোগ দেন বুয়েনস আইরেসের আটলান্টিক উপকূলের মার দেল প্লাতার দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়া মার্তিনেস।

কিন্তু লন্ডনের ক্লাবে পথটা মসৃণ ছিল না মার্তিনেসের। এ ক্লাব, ও ক্লাবে ধারে, কিংবা বেঞ্চে বসেই কেটেছে দীর্ঘ এক দশক। ম্যাচে তেমন সুযোগই মেলে না তাঁর। থাকতে হয় ক্লাবের দ্বিতীয় বা তৃতীয় পছন্দের গোলকিপার হিসেবেই।

হতাশ মার্তিনেস বিরক্ত হয়ে ফুটবলটাই ছেড়ে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাই বলে মনোবল আর নিজের প্রতি বিশ্বাস ছাড়েননি। ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে মার্তিনেস লিখেছিলেন, ‘মাই টাইম উইল কাম।’

এমির জীবনে সেই সময়ের শুরুটা হলো ২০২০ সালে। আর্সেনালের মূল গোলকিপার বার্নার্ড লেনো চোটে পড়লেন। তাতে আর্সেনালের গোলপোস্ট সামলানোর দায়িত্ব গেল মার্তিনেসের ওপর। সুযোগ পেয়েই দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে আর্সেনালকে এনে দিলেন এফএ কাপ আর কমিউনিটি শিল্ডের শিরোপা। কিন্তু এরপরও আর্সেনালে ম্যাচ টাইম নিয়ে ছিল অনিশ্চয়তা। বাধ্য হয়ে পাড়ি জমালেন অ্যাস্টন ভিলায়।

এর মধ্যে ২০২১ সালের কোপা আমেরিকার ঠিক আগে আর্জেন্টিনা দলেও ডাক মেলে। লিওনেল স্কালোনির দলে আরেকবার বাজিমাত করলেন। ২৮ বছর পর আর্জেন্টিনাকে জেতালেন কোপা আমেরিকা। সে পথে সেমিফাইনালে তিনটি পেনাল্টি ঠেকিয়ে হইচই ফেলে দেন ফুটবল দুনিয়ায়।

এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি মার্তিনেসকে। পরের বছর ইউরো চ্যাম্পিয়ন ইতালিকে হারিয়ে ফিনালিসিমা জয়, কাতার বিশ্বকাপে দানবীয় পারফরম্যান্সে আর্জেন্টিনার ৩৬ বছর অপেক্ষার অবসান। ফাইনালের শেষ মুহূর্তে কোলো মুয়ানির শট যেভাবে ঠেকিয়েছেন, ফাইনাল ইতিহাসের অন্যতম সেরা সেভের তালিকায় স্থান পেয়েছে সেটি।

শুধু বল ঠেকানোই নয়, অদ্ভুত সব কীর্তিকলাপে প্রতিপক্ষকে ভড়কে দেওয়ার কাজটাও সমানতালে করেছেন মার্তিনেস। টাইব্রেকারে মাইন্ড গেম কিংবা স্নায়ুযুদ্ধের লড়াইয়ে প্রতিপক্ষকে বারবার ক্ষতবিক্ষত করেছেন। কাতারের ফাইনালে কিংসলে কোমানের শট ঠেকিয়ে দেওয়া, কিংবা চুয়ামেনির মনোযোগ নষ্ট করে শট লক্ষ্যভ্রষ্ট করা- এসব যেন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়- টাইব্রেকার এলেই মার্তিনেস যেন লায়ন হার্টেড হয়ে যান, হয়ে যান সবার চেয়ে আলাদা। পরিসংখ্যানও সেটাই জানাচ্ছে, টাইব্রেকারে কখনো হারেননি মার্তিনেস!

দুবার ফিফার বর্ষসেরা গোলকিপারের পুরস্কার জেতা মার্তিনেস কাতার বিশ্বকাপের আগে ঘোষণা দিয়েছিলেন, আর্জেন্টিনা তথা মেসিকে বিশ্বকাপ এনে দিতে প্রয়োজনে জীবন দেবেন। সেই কথা রেখেছেন মার্তিনেস। ২০২৬ বিশ্বকাপ যখন সামনে, নিজেকে আরেকটা চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন ৩৩ বছর বয়সী এ গোলকিপার। আর্জেন্টিনার জার্সিতে আরেকটা বিশ্বকাপ জিতে অবসর নিতে চান। এই কথাটা যদি রাখতে পারেন, আজীবন আর্জেন্টিনা সমর্থকদের মনে আলাদা হয়ে থাকবেন মার্তিনেস!

দেশপক্ষ/ এমএইচ

 

 

নিউজটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন