ঢাকা, শুক্রবার, ২২ মে ২০২৬, ১:০৬ পূর্বাহ্ন

নৈতিকতার চরম অধ:পতন

# খুনোখুনিতে দেশজুড়ে অস্থিরতা বাড়ছে,উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা
# চলতি বছরের প্রথম চার মাসে মামলা হয়েছে ১৩ হাজার ২২১টি, খুন হয়েছে ১ হাজার ১৪২
# রাজনৈতিক সহিংসতা-আধিপত্য বিস্তার ও সামাজিক অবক্ষয়কে দায়ি করছেন অপরাধ বিশ্লেষকরা

সমাজে অস্থিরতা, অপরাধপ্রবণতা, লাগামহীন দুর্ঘটনা দিনকে দিন বাড়ছে। নাবালিকা থেকে শুরু করে-মধ্যবয়সিও রক্ষা পাচ্ছে না ধর্ষণ-পাশবিক নির্যাতন থেকে। পৈশাচিক কায়দায় খুন, শিশু নির্যাতন, সন্ত্রাসবাদ, মাদক, লুটপাট, দুর্নীতি, মারামারি আর হানাহানি এখন নিত্যদিনের ঘটনা। তবে দেশে পারিবারিক কলহ, হিংসা-বিদ্বেষ এসবও অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেড়েছে। বিগত সময়গুলোয় পারিবারিক কলহের কারণে পরিবারের সবার একসাথে আত্মহত্যার মতো ঘটনাও ঘটছে। স্বামী-স্ত্রীর কলহে প্রাণ দিতে হচ্ছে নিষ্পাপ শিশুদের। ধর্ষণ করে শিশু ও নারীদের নির্মমভাবে হত্যা করা হচ্ছে, যা বর্বর যুগকেও হার মানিয়েছে। দেশে কিশোর গ্যাং এখন বড় সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে। নীতি-নৈতিকতার দুর্ভিক্ষ চরম আকার ধারণ করেছে। তবে এসব ঘটনায় দেশজুড়ে রাজনীতি-সামাজিক সংগঠনসহ প্রতিবাদ-নিন্দার ঝড় বইতে শুরু করেছে।

জানা গেছে, হাসিনা সরকারের পতনের পর প্রায় ২ বছরেও দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখনো স্বাভাবিক হয়নি। উল্টো সারাদেশে সহিংসতা, খুন, মব সন্ত্রাস, রাজনৈতিক প্রতিশোধ, চাঁদাবাজি এবং নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ক্রমেই বেড়েই চলেছে। তবে সরকার এবং পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে। বড় ধরনের অপরাধের প্রবণতা স্থিতিশীল। কিন্তু পুলিশের নিজস্ব পরিসংখ্যানেই উঠে এসেছে ভিন্ন চিত্র। চলতি বছরের প্রথম চার মাসে নানা অপরাধে সারা দেশে মোট ১৩ হাজার ২২১টি মামলা হয়েছে। একই সময়ে খুন হয়েছেন এক হাজার ১৪২ জন। পারিবারিক বিরোধ, সামান্য কথা কাটাকাটি ও আড্ডার মারামারিও প্রাণঘাতী রূপ ধারণ করছে। প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন স্থানে এক বা একাধিক হত্যার ঘটনা ঘটছে। মারামারি-খুনোখুনি যেন এখন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। এমন রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পেছনে মূলত সহনশীলতার অভাব, পারিবারিক ও সামাজিক অবক্ষয় এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখানোর প্রবণতা দায়ী বলে মনে করেন সমাজবিজ্ঞানীরা। তারা বলছেন, মানুষে মানুষে ধৈর্য ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ কমে যাওয়ায় ছোটখাটো ভুল বোঝাবুঝি বা মতবিরোধ দ্রুত সহিংসতায় রূপ নিচ্ছে। তা ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তি, মাদকের বিস্তার এবং অর্থনৈতিক চাপে মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে, যা ক্ষোভ ও আবেগের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে। চলতি বছরের প্রথম চার মাসে নানা অপরাধে সারা দেশে মোট ১৩ হাজার ২২১টি মামলা হয়েছে। একই সময়ে খুন হয়েছেন এক হাজার ১৪২ জন। পুলিশ সদর দপ্তরের অপরাধ পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, দেশে খুনোখুনি ও সামাজিক অস্থিরতা বৃদ্ধির পেছনে মূলত কাজ করছে আধিপত্য বিস্তার, পারিবারিক ও সামাজিক অবক্ষয়, রাজনৈতিক সহিংসতা, এবং অর্থনৈতিক অস্থিরতা। এছাড়া আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের গোয়েন্দা তৎপরতা ও দ্রুত পদক্ষেপের ঘাটতিকেও অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। সর্বশেষ রামিসা আক্তার নামে আট বছরের শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা এবং মাথা বিচ্ছিন্ন করার নৃসংসতা দেশজুড়ে প্রতিবাদের ঝড় বইছে। গত মঙ্গলবার রাজধানীর পল্লবীতে এ ঘটনার পর ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। একটি শিশুকে এমন রোমহর্ষক হত্যা মেনে নিতে পারছেন না কেউ। এরইমধ্যে ঘাতক সোহেল (৩২) ও তার স্ত্রী স্বপ্নাকে আটক করেছে পুলিশ। আদালতে নিজের দোষও স্বীকার করেছেন ঘাতক। কিন্তু মেয়েকে হারানোর পর বিচারব্যবস্থার ওপর গভীর আক্ষেপ ও অনাস্থা প্রকাশ করে শিশুটির বাবা আবদুল হান্নান মোল্লা বলেন, আমি বিচার চাই না, কারণ আপনারা বিচার করতে পারবেন না। আপনাদের বিচার করার কোনো রেকর্ড নেই।

এছাড়াও আলোকিত কুরআন ইন্টারন্যাশনাল হিফজ মাদ্রাসার শিক্ষার্থী মো. আব্দুল্লাহ (১০) কে বলাৎকার ও আত্মহত্যার প্ররোচনা দিয়ে হত্যাসহ দেশজুড়ে চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা বেড়েছে। সম্প্রতি গাজীপুরের কাপাসিয়ায় বসতঘরে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় একই পরিবারের পাঁচজনকে। হত্যাকারী নিহতদের বাবা, স্বামী ও দুলাভাই। ঘটনার পর হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত সেই ফোরকান মিয়ার লাশ মেলে নদীতে। নিজেদের বসতঘরের মেঝেতে পাশাপাশি পড়ে থাকা লাশগুলো ছিল তারই তিন মেয়ে মীম (১৫), মারিয়া (৮) ও ফারিহার (২)। জানালার পাশে ছিল স্ত্রী শারমিনের হাত-মুখ বাঁধা নিথর দেহ এবং বিছানার ওপর শ্যালক রসুলের রক্তাক্ত লাশ। গত ৯ মে এ পাঁচ লাশ উদ্ধারের ঘটনা আলোড়ন তুলেছিল সারা দেশে। লাশের ভয়ানক দৃশ্য দেখে আঁতকে ওঠেন সবাই। চোখের জল ফেলতে বাধ্য হন প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও।

সেই সঙ্গে প্রশ্ন ওঠে-যে বাবা নিজের জীবন দিয়ে সন্তানদের বাঁচান, স্ত্রীকে নিরাপত্তা দেন, কীসের ক্ষোভে, কেন, কীভাবে একজন বাবা নিজের সন্তানদের জবাই করতে পারলেন? কেনইবা হত্যা স্ত্রী ও শ্যালককে। গত ১৩ মে উদ্ধার করা হয় প্রবাসী মোকাররম মিয়ার (৩৭) আট টুকরা লাশ। প্রথমে পাওয়া যায় মস্তকবিহীন সাত টুকরা; পরে মাথা উদ্ধার করা হয়। গ্রেপ্তারের পর ১৭ মে মুগদা-মান্ডায় সংঘটিত এ ঘটনার রোমহর্ষক ও শরীর হিম করা বর্ণনা দেন খুনিরা। ১৫ মে শরীয়তপুরে সদর উপজেলার চন্দ্রপুর এলাকায় পারিবারিক কলহের জেরে স্বামীকে হত্যা করে মরদেহ টুকরো টুকরো করে ড্রামে ভরে রাখেন স্ত্রী। পরে দেহের অংশ বিভিন্ন স্থানে ফেলে দিয়ে মাংস ফ্রিজে সংরক্ষণ করতে গিয়ে স্থানীয়দের কাছে ধরা পড়েন। ১৬ মে নাটোর সদরে ধারালো অস্ত্র দিয়ে বৃদ্ধ স্বামীকে গলা কেটে হত্যা করেছেন স্ত্রী রত্নেজান বেগম (৬৫)। ১৫ মে সিলেটে রাতের আঁধারে ঘর থেকে কিশোরীকে তুলে নিতে ব্যর্থ হয়ে দাদিকে খুন করেছে দুর্বৃত্তরা। গোয়াইনঘাট উপজেলার রুস্তুমপুর ইউনিয়নের মাটিকাঁপা গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।

একইদিন সন্ধ্যায় বিয়ানীবাজারে এক কিশোরের ছুরির আঘাতে আরেক কিশোর খুন হয়েছে। ১৫ মে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে ছেলের মাদককারবারে বাধা দেওয়ায় বাবার সঙ্গে কথা কাটাকাটির জেরে ছেলের কিল-ঘুষি ও লাথির আঘাতে আবু আহম্মদ ডিলারের (৭০) মৃত্যু হয়। একইদিন কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলায় জমিজমাসংক্রান্ত দীর্ঘদিনের বিরোধের জেরে চাচার বিরুদ্ধে আপন ভাতিজাকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। নিহত আনোয়ার হোসেন (৩৫) পূর্বচর পাড়াতলা গ্রামের সাফি উদ্দিনের ছেলে। অভিযুক্ত মরম আলী একই গ্রামের আব্দুল হেকিমের ছেলে। এ ছাড়া গত ২৮ এপ্রিল রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকায় প্রকাশ্যে গুলি করে শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটনকে হত্যা করা হয়। তবে পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের প্রথম চার মাসে (জানুয়ারি-এপ্রিল) সারা দেশে ১ হাজার ১৪২টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ১০টির মতো খুনের ঘটনা ঘটেছে দেশে। এপ্রিলে ২৮৭টি হত্যাকাণ্ড ঘটে। ওই চার মাসে শুধু রাজধানী ঢাকাতেই ৭৮টি হত্যাকাণ্ড ঘটে।

এ বিষয়ে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মেখলা সরকার বলেন, বিশ্বব্যাপী একটা অস্থিরতা চলছে। বাংলাদেশেও রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার সঙ্গে প্রযুক্তির রেশ প্রকট আকার ধারণ করেছে। আত্মিক বন্ধন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে মানুষ। সেই সঙ্গে নিজের লোভ পূরণে উদ্গ্রীব হয়ে পড়া, পরিবারের সঙ্গে সংযোগ কমে যাওয়া, স্বজনদের সঙ্গে সহমর্মিতার অভাব, প্রযুক্তি আসক্তি, টেলিভিশনে ক্রাইম প্যাট্রলের মতো অনুষ্ঠান প্রচার, নেটফ্লিক্সে ভয়ানক ছবি দেখা, সংবেদনশীলতার সংকট, ছোট থাকতেই বিভিন্ন গেমসের মাধ্যমে খুন করা শেখা, সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধ বাধাগ্রস্ত হওয়া, নৈতিকতার অভাব, সংস্কৃতির চর্চার অভাবসহ নানান কারণেই সমাজে খুনাখুনি বাড়ছে। এর থেকে পরিত্রাণ পেতে সংস্কৃতিচর্চা, খেলাধুলার সুযোগ ও ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রতি জোর দিতে হবে। প্রযুক্তির ব্যবহারও সীমিত পরিসরে করতে হবে। তবে পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, সামাজিকভাবে মানুষ খুব অল্পতেই ধৈর্যহারা হয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া নৈতিক অবক্ষয়, পারিবারিক বন্ধন কমে যাওয়া, অবৈধ সম্পর্কে জড়ানোর কারণে খুনাখুনি বাড়ছে। তবে পুলিশ তৎপর রয়েছে। আমরা আশা করছি খুব শীঘ্রই অপরাধ কমে আসবে।

দেশপক্ষ/ এমএইচ

নিউজটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

ট্যাগঃ