
২০০৮ সালের ১১ জুন বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ। দীর্ঘ ১১ মাস কারাভোগের পর সেদিন কারামুক্ত হয়েছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রক্ত ও আদর্শের যোগ্য উত্তরসূরি, বাঙালির আস্থার শেষ ঠিকানা—জননেত্রী শেখ হাসিনা। তাঁর সেই মুক্তি কেবল একজন নেত্রীর মুক্তি ছিল না, তা ছিল অবরুদ্ধ গণতন্ত্রের শৃঙ্খল মোচনের প্রতীক। ১/১১-এর তথাকথিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলার নামে যে গভীর ষড়যন্ত্রের জাল বুনেছিল, তার মূল লক্ষ্যই ছিল বঙ্গবন্ধুকন্যাকে রাজনীতি থেকে নিশ্চিহ্ন করা। কিন্তু ষড়যন্ত্রকারীরা সেদিন বুঝতে পারেনি, শেখ হাসিনাকে বন্দি করা মানে গোটা জাতিকে বন্দি করা। তাঁর কারামুক্তির দিনটি আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয়—অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করলে সত্যের জয় অনিবার্য। জননেত্রী শেখ হাসিনার সেই অদম্য মানসিকতা আজও আমাদের পথ দেখায়, প্রেরণা দেয় সব ষড়যন্ত্রের বেড়াজাল ছিন্ন করে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে।
২০০৭ সালের ১৬ জুলাই ছিল আওয়ামী লীগ সভাপতি বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার রাজনৈতিক নেতৃত্বের জন্য ভয়ঙ্কর একটি চ্যালেঞ্জের দিন। শেখ হাসিনার নেতৃত্বের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের চক্রান্তের ধারাবাহিকতায় সেদিন আজকের জননন্দিত এই নেত্রীকে বিতর্কিত করে জনগণের আস্থা ও ভালোবাসার জায়গা থেকে দূরে সরিয়ে ফেলার হীন প্রচেষ্টা গ্রহণ করা হয়েছিল। যদিও সেই ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হয়ে যায় এদেশের আপামর জনগণের প্রতিবাদী ভালোবাসার কাছে। আর এ জন্যই দিনটি স্মরণীয়। জননেত্রী শেখ হাসিনাকে কারাগারে পাঠিয়ে এই দেশের গণতন্ত্রকে হত্যার নীলনকশা করেছিল ষড়যন্ত্রকারীরা। তাই ইতিহাসের এই কালো দিনটিকে মুজিবাদর্শের নেতাকর্মী ও গণতন্ত্রকামী দেশের আপামর জনগণ ‘গণতন্ত্র অবরুদ্ধ দিবস’ হিসেবে পালন করে।
২০০৭ সালের ১৬ জুলাই ভোরে ফখরুদ্দিন-মইনউদ্দিনের নেতৃত্বাধীন সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার বঙ্গবন্ধুকন্যাকে ধানমন্ডির নিজ বাসভবন সুধাসদন থেকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারের জন্য সুধাসদনের চারদিক বিভিন্ন বাহিনীর দুই সহস্রাধিক সদস্য ঘিরে রেখেছিল। জননেত্রী শেখ হাসিনা এর মধ্যে ফজরের নামাজ আদায় করেন। সাদা শাড়ি পরিহিতা শেখ হাসিনা যৌথবাহিনীর কাছে জানতে চান, কেন তাকে গ্রেফতার করা হচ্ছে? দেশে কী সামরিক শাসন জারি হয়েছে? কোনো উত্তর ছিল না আইন প্রয়োগকারী সংস্থার লোকদের মুখে।
গ্রেফতারের আগে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার নামে দেয়া হয় একাধিক মামলা। বাসা থেকে তাঁকে পুলিশের একটি জিপে করে ঢাকার সিএমএম আদালতে নিয়ে যাওয়া হয়। আদালত এলাকায় তাঁর নিরাপত্তায় নিয়োজিত পুলিশবাহিনীর দায়িত্বহীনতার কারণে তিনি নাজেহালের শিকার হন। সেদিন সিএমএম কোর্টে দাঁড়িয়ে বাঙালির আস্থা ও ভালোবাসার ঠিকানা শেখ হাসিনা সরকারের অন্যায় আচরণের বিরুদ্ধে আইনি ভাষায় ৩৬ মিনিট বক্তব্য রাখেন। সেই সকালেই অগণিত রাজনৈতিক কর্মী নিজের জীবনকে তুচ্ছ ভেবে কোর্টপ্রাঙ্গণে ছুটে গিয়েছিলেন অন্যায়ের প্রতিবাদ জানাতে। আদালতে শেখ হাসিনার জামিনের আবেদন নামঞ্জুর করে। এরপর শেখ হাসিনাকে জাতীয় সংসদ ভবনের পাশে বিশেষ কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। ওই সময়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের দায়েরকৃত কয়েকটি মামলায় বিশেষ জজ আদালত তাঁর বিরুদ্ধে বিচার কার্যক্রম শুরু করেন। পরবর্তীতে ওই সব মামলার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে শেখ হাসিনা হাইকোর্টে রিট করেন। হাইকোর্ট মামলাগুলোর বিচার কার্যক্রমের ওপর স্থগিতাদেশ দেন।
গ্রেফতারের পরই বঙ্গবন্ধুকন্যার মুক্তির দাবিতে দেশে-বিদেশে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। প্রায় ১১ মাস অতিবাহিত হলে শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী তাঁকে যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসা করানোর দাবি জানান। উন্নত চিকিৎসার স্বার্থে কারাবন্দি শেখ হাসিনাকে ২০০৮ সালের ১১ জুন আট সপ্তাহের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হয়। সেখানে তিনি কান ও চোখের চিকিৎসা নেন। দেশে ফেরার পর আবার তাঁকে নিয়ে ষড়যন্ত্র চলতে থাকে।
কারাবরণের পর প্রায় এক বছর বন্দি ছিলেন গণতন্ত্রের মানসকন্যা, অবরুদ্ধ ছিল গণতন্ত্র। তথাকথিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ব্যানারে পদদলিত হয়েছিল ভোট ও ভাতের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম। তবে ১/১১-এর অগণতান্ত্রিক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অনুগত ব্যক্তিদের দেয়া মিথ্যা ও ষড়যন্ত্রমূলক মামলায় গ্রেফতার হয়ে কারাবরণ করলেও পরবর্তীতে সেই অভিযোগ থেকে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের যথাযথ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে অব্যাহতি পান বঙ্গবন্ধুকন্যা। শেষ পর্যন্ত সত্যের জয় হয়, মুক্তির মিছিলে শামিল হয় লক্ষ কোটি নেতাকর্মী। মুক্ত হয় অবরুদ্ধ গণতন্ত্র।
গ্রেফতারের পর শেখ হাসিনাকে রাখা হয়েছিল জাতীয় সংসদ ভবন এলাকায় স্থাপিত বিশেষ সাব-জেলে। সেখানে খাবারে ক্রমাগত বিষ মিশিয়ে তাঁকে মেরে ফেলার টার্গেট করা হয়। স্লো পয়জনিংয়ের কারণে বন্দি শেখ হাসিনা অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। সবই ছিল তাঁকে এদেশের রাজনীতি থেকে মাইনাস করার জঘণ্য ষড়যন্ত্র। এজন্য ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারির পর তাঁর দেশে ফেরার ওপর বিধিনিষেধ জারি করে সামরিক তত্ত্বাবধায়ক সরকার। তাঁকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেয়ার সেই ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হয়। তিনি দেশে প্রত্যাবর্তন করেন বীরদর্পে। উদ্দীপিত আর অনুপ্রাণিত হয় আওয়ামী লীগের লক্ষ কোটি নেতাকর্মী। যৌথবাহিনী তাঁকে মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার করার পর গণমানুষ তাঁর অনুপস্থিতি গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিল। শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রতি বিশ্বাস আর আস্থা বহুগুণে বেড়ে যায় দেশের মানুষের কাছে।
সে সময় শেখ হাসিনার সাব-জেলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের উদ্বেগ, গ্রেফতারের সংবাদ শুনে দেশের বিভিন্ন স্থানে চারজনের মৃত্যুবরণ, বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের উৎকণ্ঠা বদলে দিয়েছিল রাজনৈতিক দৃশ্যপট। কারণ তখন আদালতের চৌকাঠে শেখ হাসিনা ছিলেন সাহসী ও দৃঢ়চেতা; দেশ ও মানুষের জন্য উৎকণ্ঠিত; সত্যকথা উচ্চারণে বড় বেশি সপ্রতিভ ছিলেন জননেত্রী শেখ হাসিনা। যা কেবল বঙ্গবন্ধুকন্যা বলেই সম্ভব হয়েছে। গ্রেফতারের আগে দেশবাসীর উদ্দেশ্যে একটি চিঠি লিখে যান বঙ্গবন্ধুকন্যা। চিঠিটি নেতাকর্মীদের মাঝে নতুন আশার সঞ্চার করে। উজ্জীবিত হয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। তিনি দেশবাসীর প্রতি তাঁর আস্থার কথা জানিয়েছিলেন। গণতন্ত্র অবরুদ্ধ হওয়ায় দুঃসময়ে নেতাকর্মীরা কী করবেন তার নির্দেশনা ছিল ঐ চিঠিতে।
চিঠিতে শেখ হাসিনা লিখেছিলেন: “আমার ছালাম নিবেন। আমাকে সরকার গ্রেফতার করে নিয়ে যাচ্ছে। কোথায় জানি না। আমি আপনাদের গণতান্ত্রিক অধিকার ও অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যেই সারাজীবন সংগ্রাম করেছি। জীবনে কোনো অন্যায় করিনি। তারপরও মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়েছে। উপরে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ও আপনারা দেশবাসী আপনাদের উপর আমার ভরসা। আমার প্রিয় দেশবাসী, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের কাছে আবেদন কখনও মনোবল হারাবেন না। অন্যায়ের প্রতিবাদ করবেন। যে যেভাবে আছেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবেন। মাথা নত করবেন না। সত্যের জয় হবেই। আমি আছি আপনাদের সাথে, আমৃত্যু থাকব।”
শেখ হাসিনার লিখে যাওয়া এই আবেগময় চিঠি তাঁর মুক্তি আন্দোলনকে তরান্বিত করে। সৃষ্টি করে জনমত। অনুপ্রেরণামূলক এই চিঠিতে শেখ হাসিনা অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছিলেন। দেশের গণতান্ত্রিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির লড়াইয়ে তাঁর নেতৃত্বের একনিষ্ঠতা তখন সত্য হয়ে উঠেছিল শব্দমালার গাঁথুনিতে। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল চাঁদাবাজির। অথচ ২০০১ সালের পর বিএনপি-জামায়াত জোটের ক্ষমতাকালে তাঁর বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি মামলা দায়ের হলেও কখনো চাঁদাবাজির মামলা করা হয়নি। ভাবতে অবাক লাগে মামলাবাজ জোট সরকার থেকেও কয়েকগুণ বেশি কূটকৌশলী ও ষড়যন্ত্রকারীরা ভর করেছিল ঐ সামরিক সরকারের চারপাশে।
ভাবতে কষ্ট হয় যে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করার জন্য জীবন বাজি রেখে আন্দোলন করেছিলেন শেখ হাসিনা। বিএনপি-জামায়াত জোট সন্ত্রাসী ও পুলিশ বাহিনীর হাতে জীবন দিয়েছে ৬৮ জন। সেই আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল একটা অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন। জনগণের ভোটের অধিকার রক্ষা করে গণতন্ত্রকে সুসংহত করাও তাঁর মূল টার্গেট ছিল। মূলত শেখ হাসিনার এই চিন্তা-ভাবনার বিপরীতে যাদের অবস্থান ছিল, তাঁর নেতৃত্ব যাদের কাছে আতঙ্ক ছিল তাদের কারণেই সেদিন গ্রেফতার হয়েছিলেন তিনি।
নির্বাচনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন শেখ হাসিনা। এটাই ছিল তাঁর অপরাধ। তিনি আক্ষেপ করে বলেছিলেন- ‘আন্দোলন করে দাবি পূরণ করলাম, তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্গঠন করলাম। যেই দ্রুত নির্বাচনের কথা বললাম, সেই আমি চাঁদাবাজ হয়ে গেলাম, দুর্নীতিবাজ হয়ে গেলাম। আমার স্থান হলো কারাগারে। পাঁচটি বছর চারদলীয় জোট তন্ন তন্ন করে খুঁজেছে আমার ও আমার পরিবারের দুর্নীতির কোনো কিছু পায় কিনা, পায় নাই।’ অনেকেই বলেন মাইনাস টু ফর্মুলা বাস্তবায়নে নেমেছিল ১/১১ সরকার। কিন্তু বাস্তবে কী দেখতে পেয়েছি আমরা? মামলা-হয়রানির শিকার বেশি হয়েছে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। দিনের আলোর মতই স্পষ্ট মাইনাস টু নয়, বরং ‘মাইনাস শেখ হাসিনা’—তৃতীয় শক্তির উত্থানের প্রত্যাশা ছিল শাসকগোষ্ঠীর।
এইতো সেদিনের কথা চোখের সামনে ভেসে উঠছে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় দেশের সুদখোর, কালোটাকার মালিকরা টাকা সাদা করে রাজনীতির মাঠে নেমে পড়েছিল নতুন দল গড়ার পরিকল্পনা নিয়ে ক্ষমতায় যাওয়ার। আর সরকারের পক্ষ থেকে ঐ দলে যোগ দেয়ার জন্য নানা রকমের প্রলোভন দেখানো হয়েছিল আওয়ামী লীগের অনেক শীর্ষনেতাদেরও। আর রাজি না হলে দুদক’কে দিয়ে রাজনীতিবিদদের জনগণের কাছে বিতর্কিত করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিল সরকার, একের পর এক হয়রানিমূলক মামলা দায়ের করা হচ্ছিল। ষড়যন্ত্র সফল না হলেও পরবর্তী যেনো তারা দলে বিতর্কিত হয় তারও ছক তৈরি করেছিলেন তারা। পরবর্তীতে দূরদর্শী রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে শেখ হাসিনা দুঃসময়ের বাস্তবতা বুঝতে পেরে, তাদের আবার কাছে টেনে নেন।
চার দলীয় জোট সরকারের আমলে ৯টি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ৬টি—মোট ১৫টি মামলা করা হয় আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর বিরুদ্ধে। একটি স্বার্থান্বেষী মহল তাঁর ভাবমূর্তি, বঙ্গবন্ধু পরিবারের ঐতিহ্য নষ্ট করে শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রতি বাঙালির আস্থা ও বিশ্বাসে ফাটল ধরাতে এবং তাঁকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দিতে ‘দুদক’কে ব্যবহার করে। ২০০৭ সালের ৯ ডিসেম্বর বিদেশি প্রতিষ্ঠান নাইকোকে অবৈধভাবে গ্যাস উত্তোলনের সুযোগ দেয়ার অভিযোগ এনে শেখ হাসিনাসহ ৭ জনের বিরুদ্ধে তেজগাঁও থানায় মামলা দায়ের করে ‘দুদক’। ২০০৮ সালের ৫ মে এ মামলায় ৯জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। মামলার দায় থেকে অব্যাহতির জন্য শেখ হাসিনা ২০০৮ সালে হাইকোর্টে বাতিল আবেদন করলে ৭ জুলাই হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চ মামলার কার্যক্রম স্থগিত করে রুল জারি করেন। এই রুলের ওপর শুনানি শেষে আদালত মামলাটি বাতিল ঘোষণা করেন। এভাবে আইনি প্রক্রিয়ায় জননেত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে করা সব মামলার পরিসমাপ্তি ঘটে। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে মামলাগুলো করা হয়েছিল বলেই তাঁর বিরুদ্ধে করা অভিযোগগুলো উদঘাটিত হয়নি। এ জন্য হাইকোর্ট দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) বিধিমালার অসংগতি দূর করতে তা সংশোধনেরও নির্দেশনা দিয়েছিলেন।
এই প্রজন্মের নেতাকর্মীরা ৭৫-এর রাজনৈতিক বীভৎসতা দেখিনি, কিন্তু ২০০৭ থেকে ২০০৮ সালের ইতিহাসের নাটকীয়তা দেখেছি। দেখেছি রাজনৈতিক নেতাদের চরিত্র হনন করতে, দুদকের দৌড়ঝাঁপ। ‘মাইনাস টু’র নামে শুধু শেখ হাসিনামুক্ত রাজনীতি করতে তাদের উচ্চস্বর ও দাম্ভিকতা। ন্যায়ের শাসন প্রতিষ্ঠায় বিচারকদের অসহায়ত্ব আর প্রিয় নেত্রী শেখ হাসিনার জন্য জনগণের মমত্ববোধ আর ভালোবাসা। আজকে অনেক নেতা হয়তো সেদিনের ভূমিকা নিয়ে অনেক কথা বলবেন কিন্তু আমি মনে করি শেখ হাসিনার রেখে যাওয়া সেই আবেগময় চিঠিই তাঁর মুক্তির জন্য উজ্জীবিত করেছিল নেতাকর্মীদের। শেখ হাসিনা প্রায়ই বলেন, দলের দুঃসময়ে আওয়ামী লীগের শীর্ষনেতারা ভুল করতে পারেন, সিদ্ধান্ত নিতে দলের তৃণমূলের নেতাকর্মী কখনো ভুল করেন না। চিঠিতে দেশের মানুষের উপর ভরসা করেছিলেন বঙ্গবন্ধুকন্যা। দেশের মানুষ তার প্রতিদান দিয়েছেন ২০০৮ সালে তাঁকে দেশ সেবার সুযোগ করে দিয়ে। তৃণমূলের নেতাকর্মীদের ওপর ও দেশবাসীর ওপর জননেত্রী শেখ হাসিনার আস্থার কারণেই শেখ হাসিনাকে আটকে রাখা যায়নি কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে। শেখ হাসিনা সেদিন চিঠিতে বলেছিলেন, সত্যের জয় হবেই। সেই জয়ের কারণেই ২০০৮ সালের ১১ জুন মুক্ত হওয়ার পর শেখ হাসিনা বাংলাদেশের জনগণের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। বাংলার জনগণ শেখ হাসিনার ভালোবাসার প্রতিদান শুধু ভালোবাসাতেই দিয়েছেন। শুধু উন্নয়ন অগ্রগতি নয়, সাধারণ জনগণের ভাগ্যউন্নয়ন, সামাজিক বেষ্টনীর মাধ্যমে বিশেষ করে বয়স্ক ভাতা, মুক্তিযুদ্ধ ভাতা, বিধবা ভাতা, করোনাকালীন প্রণোদনা, অসহায় মানুষের জন্য আশ্রয়ণ প্রকল্পসহ জনকল্যাণমুখী কর্মসূচির মাধ্যমে তাদের কল্যাণে কাজ করেছিলেন তিনি। বাংলার খেটে খাওয়া সাধারণ জনগণ আর তাদের আস্থা ও বিশ্বাসের শেষ ঠিকানা জননেত্রী শেখ হাসিনার এই ভালোবাসার সেতুবন্ধন আজও অটুট।
পরিশেষে, আজ যখন আমরা ইতিহাসের এই দিনটির দিকে ফিরে তাকাই, তখন এটি স্পষ্ট যে, শেখ হাসিনার কারামুক্তি ছিল কেবল একটি আইনি বিজয় নয়, এটি ছিল জনগণের ভালোবাসার বিজয়। শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্বে বাংলাদেশ যখন উন্নয়নের মহাসড়কে অদম্য গতিতে এগিয়ে যাচ্ছিল এবং আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হচ্ছিল, তখনই ১/১১-এর কুশিলব, দেশি-বিদেশি আন্তর্জাতিক চক্র এবং স্বাধীনতা বিরোধী অপশক্তি সক্রিয় হয়ে ওঠে। তারা কোটা বিরোধী আন্দোলনের নামে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের বিভ্রান্ত করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের প্রেক্ষাপট তৈরি করে। একটি বড় ধরনের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ও দেশকে গৃহযুদ্ধের হাত থেকে রক্ষা করতে সেদিন রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনা দেশত্যাগের কঠিন সিদ্ধান্ত নেন। দেশ বিক্রির আন্তর্জাতিক ফাঁদে পা দিয়ে বিএনপি আজ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন হলেও, ৭১-এর পরাজিত শক্তি, ৭৫-এর খুনিচক্র এবং ১/১১-এর কুশিলব ড. মুহাম্মদ ইউনূস গংদের সেই পুরনো ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলা আজও সক্রিয়। তবে ষড়যন্ত্রকারীরা ভুলে গেছে, বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা কেবল একটি রাজনৈতিক দলের নেত্রী নন, তিনি বাংলাদেশের অস্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তৃণমূলের নেতাকর্মীদের প্রতি তাঁর অগাধ বিশ্বাস ও দেশের মানুষের প্রতি তাঁর যে অটুট টান, তা কোনো ষড়যন্ত্রের আগুনেই পুড়বে না। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে আমাদের অঙ্গীকার হোক—ব্যক্তি ও গোষ্ঠীগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে, অটুট ঐক্যের মাধ্যমে গণতন্ত্রের মানসকন্যাকে পুনরায় জনকল্যাণের মূল স্রোতধারায় ফিরিয়ে আনা। কারণ, শেখ হাসিনার ফিরে আসা মানেই হলো বাংলাদেশের হারানো স্বস্তি, স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির পথে অবিচল যাত্রা।
(মানিক লাল ঘোষ: সাংবাদিক ও কলামিস্ট, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সহ-সভাপতি)
দেশপক্ষ/ এমএইচ









