
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের দিকে তাকালে বারবার একটি নাম ধ্রুবতারার মতো উজ্জ্বল হয়ে ফিরে আসে—বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। ভাষার অধিকার থেকে শুরু করে স্বাধীনতার আন্দোলন, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, রাষ্ট্র গঠন এবং উন্নয়ন অভিযাত্রা—প্রতিটি অধ্যায়ে এই দলটি কখনও সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছে, কখনও আবার ইতিহাসের কঠিনতম সংকট মোকাবিলা করেছে। সাতাত্তর বছরের এই দীর্ঘ যাত্রাপথ কেবল একটি রাজনৈতিক দলের ইতিহাস নয়; এটি বাঙালির আত্মপরিচয়, সংগ্রাম, ত্যাগ এবং রাষ্ট্র নির্মাণের এক অবিচ্ছেদ্য মহাকাব্য।
পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর ১৯৪৭ সালের পরবর্তী সময়ে পূর্ব বাংলার মানুষের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় দ্রুতই অসন্তোষ ও বঞ্চনার অনুভূতি তৈরি হয়। ভাষা, সংস্কৃতি এবং অধিকার প্রশ্নে বৈষম্য স্পষ্ট হয়ে উঠলে একটি নতুন রাজনৈতিক শক্তির প্রয়োজন দেখা দেয়। এই প্রেক্ষাপটে ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন পুরান ঢাকার ঐতিহাসিক রোজ গার্ডেনে প্রতিষ্ঠিত হয় “পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ”। এটি ছিল তৎকালীন পূর্ব বাংলার গণমানুষের অধিকার আদায়ের জন্য এক নতুন রাজনৈতিক যাত্রার সূচনা।
প্রতিষ্ঠাকালীন সম্মেলনে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী সভাপতি এবং শামসুল হক সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। সে সময় কারাবন্দি থাকা সত্ত্বেও তরুণ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়। ১৯৫৩ সালে তিনি দলের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং এরপর থেকেই তাঁর সুসংগঠিত নেতৃত্বের ছোঁয়ায় দলটি তৃণমূল পর্যায়ে বাঙালির মুক্তির একমাত্র ভরসাস্থল হয়ে ওঠে। ১৯৫৫ সালে অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির চেতনায় দলের নাম থেকে “মুসলিম” শব্দটি বাদ দিয়ে নতুন নামকরণ করা হয় “আওয়ামী লীগ”, যা ছিল রাজনৈতিক আদর্শের এক ঐতিহাসিক রূপান্তর।
আওয়ামী লীগের অর্জনের ঝুলি অত্যন্ত সমৃদ্ধ। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলন এবং ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান—প্রতিটি আন্দোলনে আওয়ামী লীগ ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন বাঙালির চালিকাশক্তি। ১৯৬৬ সালের ছয় দফা ছিল বাঙালির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির সনদ। এরপর ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয় পাকিস্তানি শাসন কাঠামোকে কাঁপিয়ে দেয়। বাঙালির ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ সময় ও অনুপ্রেরণার উৎস হলো ৭ মার্চ। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের প্রতিটি বাক্য ছিল বাঙালির মুক্তির সনদ, যা জাতিকে নিরস্ত্র থেকে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার চূড়ান্ত নির্দেশ দিয়েছিল। ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বেই স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ বিশ্ব মানচিত্রে স্থান করে নেয়, যা রাজনৈতিক ইতিহাসের এক বিরল ঘটনা।
তবে স্বাধীনতার পর থেকেই আওয়ামী লীগের যাত্রা মোটেও কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে যে ষড়যন্ত্রের বীজ বপন করা হয়েছিল, তা আজও কোনো না কোনোভাবে সক্রিয়। এরপর দীর্ঘ সময় সামরিক ও স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হয়েছে। এই কঠিন সময়ে ১৯৮১ সালে বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আসেন। নেতৃত্বহীন ও বিপর্যস্ত আওয়ামী লীগের হাল ধরেন তিনি। চরম প্রতিকূলতা, জীবননাশের হুমকি, মামলা ও কারাবাস উপেক্ষা করে তিনি দলকে পুনর্গঠন করেন এবং আবারও জনগণের রাজনীতির মূল স্রোতধারায় ফিরিয়ে আনেন। তাঁর বলিষ্ঠ নেতৃত্বে ১৯৯৬ এবং ২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ পর্যন্ত বাংলাদেশ উন্নয়নের এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছায়। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট এবং ডিজিটাল অবকাঠামোসহ মেগা প্রকল্পগুলো দেশের অর্থনৈতিক মানচিত্র বদলে দেয়।
কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগ আবারও ইতিহাসের ভয়াবহতম দুঃসময়ের মুখোমুখি। আজ এই দলটির ওপর নেমে এসেছে নজিরবিহীন দমন-পীড়ন। দলের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ, সাবেক মন্ত্রী ও এমপি থেকে শুরু করে তৃণমূলের লক্ষাধিক নেতাকর্মীর নামে আজ ভিত্তিহীন ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা দায়ের করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় শীর্ষ নেতৃত্বসহ দলের অসংখ্য নেতাকর্মী আজ কারাগারে অমানবিক জীবনযাপন করছেন। লক্ষাধিক কর্মী আজ বাড়িঘর ছাড়া, পরিবার-পরিজন হারিয়ে অবর্ণনীয় কষ্ট করছেন। উগ্রবাদী ও ষড়যন্ত্রকারী মহলের দ্বারা অসংখ্য নেতাকর্মী মব ভায়োলেন্সের শিকার হয়েছেন, অনেকে নির্মমভাবে জীবন দিয়েছেন, যা গণতন্ত্রের জন্য এক চরম কলঙ্কজনক অধ্যায়।
এমনকি বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনাকে রাজনীতি থেকে চিরতরে সরিয়ে দিতে তাঁর বিরুদ্ধে অসংখ্য মামলা দিয়ে ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করা হয়েছে। একটি চিহ্নিত গোষ্ঠী আজ আওয়ামী লীগের রাজনীতি নিষিদ্ধ করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের কার্যক্রমকে রুদ্ধ করে দেওয়া মানেই হলো বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে ধ্বংস করা এবং মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে ভূলুণ্ঠিত করা। এই অপশক্তি চায় বাংলাদেশকে একাত্তরের পরাজিত শক্তির আদর্শে, অর্থাৎ পাকিস্তানি ভাবধারায় ফিরিয়ে নিতে। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী, আওয়ামী লীগকে নিস্তব্ধ করা অসম্ভব। ১৯৫৮, ১৯৭১, ১৯৭৫ বা ২০০৭—প্রতিটি সংকটের পর দলটি ফিনিক্স পাখির মতো ছাই থেকে জেগে উঠেছে। আজ যখন দলের প্রধান শেখ হাসিনাকে ঘিরে নতুন করে প্রত্যাবর্তনের স্বপ্ন দেখছে তৃণমূল, তখন এটি স্পষ্ট যে, আওয়ামী লীগকে গণমানুষের হৃদয়ের সীমানা থেকে বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব নয়।
আওয়ামী লীগের ইতিহাস তাই কেবল ক্ষমতার ইতিহাস নয়, বরং টিকে থাকা, ফিরে আসা এবং পুনর্গঠনের ইতিহাস। প্রতিটি সংকটের পর দলটি নতুনভাবে সংগঠিত হয়েছে এবং আবারও রাজনৈতিক বাস্তবতার কেন্দ্রবিন্দুতে ফিরে এসেছে। ইতিহাসের শিক্ষা হলো—যে দল জনগণের সংগ্রাম, আশা ও আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত থাকে, তাকে কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বা সাময়িক রাজনৈতিক পরিবর্তন দিয়ে ইতিহাস থেকে মুছে ফেলা যায় না। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন, শেখ হাসিনার সাহসী নেতৃত্ব এবং লাখো কর্মীর ত্যাগে গড়ে ওঠা আওয়ামী লীগের ইতিহাস মূলত বাংলাদেশের ইতিহাসেরই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। সাতাত্তর বছরের এই যাত্রাপথে দলটি বহুবার আঘাত পেয়েছে, বহুবার সংকটে পড়েছে, আবার বহুবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে। সেই ধারাবাহিকতাই ভবিষ্যতেও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আওয়ামী লীগকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা হিসেবে স্থাপন করে রাখবে।
(মানিক লাল ঘোষ : সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক। ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সহ সভাপতি)








