ঢুকানো হচ্ছে জীবিত, আর বের হয়ে আসছেন লাশ হয়ে। এমনই এক অজানা আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশের কারাগারগুলো। প্রায় ঘটছে রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনা, যারা প্রায় শতভাগই আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী। গত ৫ আগস্টের পর নানাভাবে নির্যাতিত-নিপীড়িত হচ্ছেন আওয়ামী লীগ ও সহযোগী অঙ্গ সংগঠনের শীর্ষ থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা। তবে সবচেয়ে ভয়ানক হচ্ছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ থেকে শুরু করে দেশের সকল অর্জনে ভূমিকা রাখা কিংবা দায়িত্ব পালন করা সংগঠনটির সকল কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে যাদের গ্রেফতার করা হয়েছে, তারা জেলখানায় চরম নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। পরিকল্পিত ভাবে তাদের হত্যা করা হচ্ছে। সময়ের সঙ্গে কারাবন্দী আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মৃত্যুর তালিকা দিন দিন দীর্ঘ থেকে আরও দীর্ঘ হচ্ছে। চলতি বছরের ১২ জানুয়ারি পর্যন্ত অথ্যাৎ গত ১৮ মাসে দলটির ২০৬ জন কারান্তরীন নেতাকর্মীর মৃত্যু হয়েছে। এরপর ফেব্রয়ারি ও চলতি মার্চ মাসে আরও কয়েক জনের মৃত্যুর অভিযোগ মিলেছে।
তালিকা দেখতে ক্লিক করুন :https://www.deshpokkho.com/wp-content/uploads/2026/03/Total-Deaths-list-of-ALBD-BN.pdf

সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পূর্ব পরিকল্পিত ভাবে ছাত্র -জনতাকে রাস্তায় নামায় বিএনপি ও জামায়াত। এই আন্দোলনে পুলিশের পোশাকে জেলখানাসহ দেশের বিভিন্নস্থান গুপ্ত হামলা শুরু করে জামায়াত শিবির। এরপর পরিকল্পিত ভাবে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটানো হয়। পাশ্ববর্তী দেশ ভারতে আশ্রয় নেয় শেখ হাসিনা। একে একে দলটি এমপি- মন্ত্রী ও নেতাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বাসাবাড়িতে হামলা চালিয়ে আগুন দেয়া হয়। লুটপাট করা হয় টাকা- সোনাদানাসহ সকল আসবাবপত্রও। মবসন্ত্রাসের নামে লাঞ্ছিত করা হয় মুক্তিযোদ্ধাদেরও। অনেককে বিনা কারনে মারধর করে পুলিশের হাতে তুলে দেয়া হয়। পরে তাদের মিথ্যা মালায় গ্রেফতার করে
কারাগারে আটক রাখা হয়। তবে ৫ আগস্টের পর জীবন বাঁচাতে অনেকে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান এবং অনেকে এখনো আত্মগোপনে রয়েছেন। এইসবই হয়েছে অন্তবর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সময়। বর্তমানে বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় থাকার পরও ইউনূস সরকারের আমলারা বিভিন্ন ভাবে জেলখানায় গ্রেফতারকৃত নেতাকর্মীদের উপর নির্যাতন অব্যহত রেখেছেন।
কারা হেফাজতে মৃত্যু মানবাধিকারের চরম লংঘন বলে বিবেচিত হয় সারা বিশ্বে। কারাবন্দিদের নির্যাতন করলে সারা বিশ্বের মানবাধিকার সংগঠনগুলো সোচ্চার হয়, প্রতিবাদ জানায়। আর বাংলাদেশে গত ১৮ মাস ধরে চলমান এই সিস্টেমেটিক হত্যাকান্ড চলার পরেও মানবাধিকার সংস্থা মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ) ছাড়া আর কোন সংগঠনের পক্ষ থেকে কোন প্রতিবাদ, তদন্ত দাবির কোন খবর আমাদের নজরে আসেনি।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থানের পর ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত ১৫ মাসে ১১২ জন কারা হেফাজতে মারা গেছেন। সংস্থাটির হিসেবে ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত ১১ মাসে মারা গেছেন ৯৫ জন। আর ২০২৪ সালে ১২ মাসে মারা গেছেন ৬৫ জন। মৃতদের তালিকায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী রয়েছেন।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ১ জানুয়ারি ২০২৫ থেকে ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত ১২ মাসে কারাগারে ১৮ জন আওয়ামী লীগ নেতার মৃত্যু হয়েছে। শুধু চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে শুরু করে ১৫ মার্চ পর্যন্ত কারা হেফাজতে মোট ১৩ জন আওয়ামী লীগ নেতা মারা গেছেন।
গাইবান্ধা ফুলছড়ি উপজেলার কাঞ্চিপাড়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও কাঞ্চিপাড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবু বকর ছিদ্দিক মারা যাওয়ার পর তাঁর ভাতিজা সিফাত অভিযোগ করেন, ‘অসুস্থ হলেও এ খবর আমরা জানতে পারি পরদিন। এই দীর্ঘ সময়ও কারা কর্তৃপক্ষ থেকে তাঁর অসুস্থতা এবং মৃত্যুর বিষয়টি আমাদের জানানো হয়নি”।
সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন কারাগারে বন্দি অবস্থায় আওয়ামী লীগের আরও বেশ কিছু নেতাকর্মীর মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও প্ল্যাটফর্মে কারান্তরীণ অবস্থায় মৃত্যুবরণকারী নেতাকর্মীদের একটি বিস্তারিত তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে।
প্রকাশিত তালিকায় দেখা যায়, গ্রাফিক্স কার্ডে প্রায় ৪২ জন ব্যক্তির ছবি ও পরিচয় পাওয়া গেছে। তালিকায় উল্লেখিত ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন- বগুড়া: আব্দুল লতিফ, আব্দুল মতিন, এবং শফিকুল ইসলাম খান। কেরানীগঞ্জ: আজগর আলী এবং সাইদুর রহমান সুজন। খুলনা: আখতার সিকদার এবং জয়নাল আবেদিন জনি। চট্টগ্রাম: আব্দুর রহমান এবং ফারজাত হোসেন সজীব। এছাড়াও দিনাজপুর, পটুয়াখালী, মানিকগঞ্জ, এবং কাশিমপুরসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের নেতাকর্মীদের নাম এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
কারাগারে নেতাকর্মীদের এই মৃত্যুর তালিকা প্রকাশ হওয়ার পর রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। মানবাধিকার কর্মী এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো এই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং জেলখানার অভ্যন্তরীণ চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। অনেক ক্ষেত্রেই পরিবারের পক্ষ থেকে যথাযথ চিকিৎসা না পাওয়া বা অযত্নের অভিযোগ আনা হচ্ছে।
যদিও কারা কর্তৃপক্ষ বা সরকারের পক্ষ থেকে এই নির্দিষ্ট তালিকা বিষয়ে এখনও আনুষ্ঠানিক কোনো বড় বিবৃতি পাওয়া যায়নি। তবে সাধারণত জেলখানায় মৃত্যুর ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়া অনুযায়ী ময়নাতদন্ত ও তদন্ত কমিটি গঠনের নিয়ম রয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই ঘটনাগুলোর স্বচ্ছ তদন্ত হওয়া জরুরি।
একসাথে এত বিপুল সংখ্যক রাজনৈতিক কর্মীর কারাগারে মৃত্যুর বিষয়টি জনমনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এই তালিকার সত্যতা এবং মৃত্যুর সঠিক কারণগুলো খতিয়ে দেখতে বিচারবিভাগীয় তদন্তের দাবি উঠছে বিভিন্ন মহল থেকে।
তবে এসব বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি অপরাধ বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, সত্যিকার অর্থে কথা বললে জীবন বাঁচানো দায়।
এ বিষয়ে সম্প্রতি জেলখানা থেকে জামিনে এসেছেন এমন কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়,বর্তমানে জেলখানায় আওয়ামী লীগের নেতাকমীদের উপর অমানবিক নির্যাতন-নিপীড়ন চালানো হচ্ছে। মূলত নির্যাতনের মাধ্যমে তাদের মৃত্যুরপথে ঠেলে দেয়া হচ্ছে।







