
জাতির জনকের রক্ত ও আদর্শের উত্তরাধিকার হয়েও যাঁর আচরণে কখনো অহমিকামুক্ত এক সরলতার প্রকাশ ঘটেছে, তিনি হলেন তরুণ প্রজন্মের চিরন্তন আইকন শেখ কামাল। মাত্র ছাব্বিশ বছরের সংক্ষিপ্ত অথচ বর্ণাঢ্য জীবনে সংগীত চর্চা, অভিনয়, বিতর্ক, উপস্থিত বক্তৃতা কিংবা ক্রীড়াঙ্গন—কোন ক্ষেত্রে না তিনি প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে গেছেন? তাঁর এই বহুমুখী প্রতিভাকে ম্লান করতে এবং জনপ্রিয়তায় ঈর্ষান্বিত হয়ে কুচক্রী মহল যুগে যুগে নানা অপপ্রচার ও ষড়যন্ত্র চালালেও তা তাঁর কীর্তিকে ছাপিয়ে যেতে পারেনি। বর্তমান বাস্তবতায় তাঁর বহুমাত্রিক কর্মময় জীবন এবং আদর্শ তরুণ সমাজের জন্য এক অবিনাশী প্রেরণার উৎস হিসেবে বারবার ফিরে আসে।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের জ্যেষ্ঠ পুত্র ১৯৪৯ সালের ৫ আগস্ট গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন শেখ কামাল। ৫ ভাইবোনের মধ্যে তাঁর অবস্থান দ্বিতীয়। ঢাকা শাহীন স্কুল থেকে ম্যাট্রিক, ঢাকা কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজ বিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। ছাত্রলীগের একনিষ্ঠ কর্মী এবং সংগঠক হিসেবে ছাত্রদের কাছে প্রিয়পাত্র ছিলেন তিনি। ৬ দফা ও ১১ দফা আন্দোলন এবং ৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানে শেখ কামালের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাত্রসমাজকে উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত করতো। বাংলার ছাত্রসমাজ সেদিন শেখ কামালের মাঝে খুঁজে পেতো বঙ্গবন্ধুর প্রতিচ্ছবি।
মহান মুক্তিযুদ্ধে অন্যতম সংগঠক হিসেবে ছাত্রসমাজকে সুসংগঠিত করে দেশমাতার মুক্তিযুদ্ধে হাতিয়ার তুলে নিয়েছিলেন তিনি। দায়িত্বে ছিলেন মুক্তিঝাহিনীর প্রধান সেনাপতি জেনারেল ওসমানীর এডিএ হিসেবে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে স্বাধীন বাংলার ফুটবল দলকে সুসংগঠিত করেন শেখ কামাল। তিনি স্বপ্ন দেখতেন দেশ স্বাধীন হলে পাল্টে যাবে বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের চিত্র এবং ক্রীড়া ক্ষেত্রে অনন্যা উচ্চতায় বহির্বিশ্বে আসীন হবে বাংলাদেশ। স্বাধীনতা অর্জের পর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া দেশ পুনর্গঠনে তাঁর অসামান্য মেধাকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেন শেখ কামাল।
যুদ্ধের পর সেনাবাহিনী ত্যাগ করেন তিনি, ফিরে যান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং সম্পন্ন করেন সমাজবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি। স্বাধীন বাংলাদেশের ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে এক জনপ্রিয় যুবকের নাম শেখ কামাল। অধ্যয়নের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে তাঁর পদচারণ ছিলো মুখর। তিনি ছায়ানট থেকে নেন সেতার শেখার তালিম। বন্ধুদের সহযোগিতায় গড়ে তোলেন নাটদল (ঢাকা থিয়েটার) এবং আধুনিক সংগীত সংগঠন স্পন্দন শিল্পীগোষ্ঠী। দেশের জনপ্রিয় ক্রীড়া সংগঠন ‘আবাহনী ক্রীড়াচক্র’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ক্রীড়াঙ্গনে ‘স্মরণীয় হয়ে আছেন শেখ কামাল। ১৯৭২ সালে আবাহনী সমাজকল্যাণ সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। এই সংস্থার নামে সুসংগঠিত করেন ফুটবল দল ‘ইকবাল স্পোর্টিং’ ক্রিকেট ও হকির দল ‘ইস্পাহানী স্পোর্টিং’। এসব দলের সমন্বয়ে নব উদ্যমে যাত্রা শুরু হয় আবাহনী ক্রীড়াচক্রের। শেখ কামালের সহধর্মিণী সুলতানা খুকু ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্রী। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে যাঁর পরিচিতি ছিলো প্রতিভাবান অ্যাথলেট হিসেবে।
শেখ কামালের স্বপ্ন ছিলো ফুটবল, ক্রিকেট, হকি খেলার মাধ্যমে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরার। স্বপ্ন বাস্তবায়নের আপ্রাণ চেষ্টা ছিলো তাঁর। ফুটবলের উন্নতির জন্য ১৯৭৩ সালে আবাহনীতে নিয়ে এসেছিলেন বিল হার্টকে। শুধু ক্রীড়াজন নয়, শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির মাধ্যমে বাংলাদেশকে বহির্বিশ্বে সমৃদ্ধ করার স্বপ্ন দেখতেন তিনি। শেখ কামালের স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় স্বাধীনতাবিরোধী ও একটি কুচক্রীমহল। নানামুখী ষড়যন্ত্র ও অপপ্রচারের মাধ্যমে শেখ কামালের জনপ্রিয়তার লাগাম টেনে ধরা ও তাঁর উদ্যমতাকে দমনের ষড়যন্ত্র করে ওই কুচক্রীমহলটি।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট মা ও বাবা সহ পরিবারের ১৮ জন সদস্যের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকদের নির্মম বুলেটে মৃত্যুর শিকার হন তিনি। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারের হত্যাকাণ্ডের এই নারকীয় ঘটনায় প্রথম শহীদ শেখ কামাল। বজলুল হুদা তার স্টেন গান দিয়ে বঙ্গবন্ধুর বড় ছেলেকে হত্যা করে। আদালতের দেওয়া বঙ্গবন্ধুর বাড়ির অন্যতম পাহারাডার হাবিলদার কুদ্দুস সিকদারের সাক্ষ্য থেকে জানা যায়, বাড়িতে প্রবেশই করে ঘাতক চক্রের সদস্য মেজর বজলুল হুদা এবং ক্যাপ্টেন নূর চৌধুরী। তার সঙ্গে আরও কয়েকজন বাড়িতে ঢুকেই শেখ কামালকে দেখতে পায়।
সাথেই বজলুল হুদা স্টেন গান দিয়ে তাকে গুলি করে। শেখ কামাল বারান্দা থেকে ছিটকে গিয়ে অভ্যর্থনা কক্ষে পড়ে যান। সেখানে গিয়ে তাকে আবারও গুলি করে হত্যা করে ঘাতক চক্র। সেই সাথে নিয়ে যায় ক্রীড়াঙ্গনের উজ্জ্বল নক্ষত্র।
কীর্তিমানের মৃত্যু নেই। যারা ষড়যন্ত্রের জাল বুনেছিলেন শেখ কামালের বিরুদ্ধে, রটিয়েছিলেন নানামুখী কুৎসা, তারা আজ ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত। বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের আজকের সাফল্য ও আধুনিকতার পেছনে রয়েছে শেখ কামালের সুদূরপ্রসারী স্বপ্নের প্রতিফলন। ক্রীড়া ক্ষেত্রে ও বহির্বিশ্বে দেশকে মর্যাদার আসনে তুলে ধরার যে স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন, সময়ের পরিবর্তনে আজ তা জাতির মনে আরও গভীরভাবে অনুভূত হয়। স্বপ্নের মৃত্যু নেই; স্বপ্নচারী শেখ কামাল যুগ যুগ ধরে বেঁচে থাকুক তরুণ সমাজের দেশপ্রেম ও অহংকার হয়ে।
(মানিক লাল ঘোষ :: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সহ সভাপতি)
দেশপক্ষ/ এমএইচ






