
আপনাদের উদ্দেশে বক্তব্য রাখার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য আমি সাউথ এশিয়ার ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবকে ধন্যবাদ জানাই। যে সব সাংবাদিক গভীর নিষ্ঠা ও সাহসিকতার সঙ্গে বাংলাদেশের ঘটনাবলী তুলে ধরে যাচ্ছেন, আমি তাঁদেরও ধন্যবাদ জানাই। সত্যকে অনুসন্ধান করা সাংবাদিকতার মূল দায়িত্ব, বিশেষ করে যখন ক্ষমতা সেই সত্যকে আড়াল করতে চায়। ইতিহাসের কঠিন সময়গুলোতে এই দায়িত্ব আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
আজ আমি কেবল এমন একজন ব্যক্তি হিসেবে কথা বলছি না, যিনি বাংলাদেশকে পাঁচবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সেবা করার গৌরব অর্জন করেছেন; বরং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা হিসেবেও কথা বলছি। আমি এমন একজন মানুষ হিসেবে কথা বলছি, যিনি বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে নিজের পুরো জীবন অতিবাহিত করেছেন। আমাকে আমার দেশ থেকে দূরে থাকতে বাধ্য করা হয়েছে, কিন্তু আমার জনগণের কাছ থেকে আমাকে কখনওই বিচ্ছিন্ন করা যায়নি।
বর্তমান সঙ্কট নিয়ে কথা বলার আগে, আমি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, নির্মমভাবে নিহত জাতীয় চার নেতা এবং আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের ৩০ লাখ শহিদের প্রতি আমার গভীরতম শ্রদ্ধা নিবেদন করছি। ১৯৭৫ সালের ১৫ অগস্ট আমি যাদের হারিয়েছি, আমার সেই পরিবারের সদস্যদেরও পরম বেদনার সঙ্গে স্মরণ করছি। আজ আমার প্রিয় ভাই শেখ কামালের জন্মদিন। সে ছিল একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, যুবনেতা, ক্রীড়া সংগঠক এবং সাংস্কৃতিক কর্মী। তার জীবন বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের সাহস, সৃজনশীলতা ও দেশপ্রেমের প্রতীক ছিল। আমি আজ গভীর ভালোবাসা, কষ্ট ও গর্বের সঙ্গে তাকে স্মরণ করছি।
গত দুই বছর ধরে আমি আমার প্রিয় বাংলাদেশকে কষ্ট পেতে দেখেছি। আমি এমন মায়েদের সঙ্গে কথা বলেছি যারা তাঁদের সন্তানদের হারিয়েছেন, এমন শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলেছি যারা চাকরি হারিয়েছেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে হিমশিম খাওয়া পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছি, অপমান ও ভয়ের মধ্যে বসবাসকারী নারীদের সঙ্গে কথা বলেছি এবং এমন তরুণদের সঙ্গে কথা বলেছি যারা নিজেদের দেশে আর কোনও ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছে না। আওয়ামি লিগের নেতা-কর্মীদের আত্মগোপনে থাকতে বাধ্য করা হয়েছে। বাড়িঘর, কর্মক্ষেত্র এবং শিক্ষাঙ্গনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। এটা সেই বাংলাদেশ নয়, যা আমরা গড়ে তুলেছিলাম। এটি সেই বাংলাদেশ নয়, যার জন্য ১৯৭১ সালে ৩০ লাখ মানুষ জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।
জুলাই ও অগস্ট ২০২৪-এর সত্য দিয়ে আমি শুরু করি। বিশ্বের সামনে একটি চরম মিথ্যা বারবার প্রচার করা হয়েছে: যে এই আন্দোলনটি কেবল একটি শান্তিপূর্ণ ছাত্র আন্দোলন ছিল। সেটি সত্য নয়। শুরু থেকেই আমার সরকার সংলাপ, আইনি প্রক্রিয়া ও ধৈর্যের মাধ্যমে বিষয়টি শান্তিপূর্ণ ভাবে সমাধানের চেষ্টা করেছে। কিন্তু সংস্কারের ভাষার আড়ালে, সংগঠিত গোষ্ঠীগুলো ছাত্রদের দাবিকে একটি সহিংস রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত করার জন্য কাজ করছিল।
২০১৮ সালে, ছাত্রদের দাবির প্রেক্ষিতে আমরা কোটা পদ্ধতি বাতিল করেছিলাম। ২০২৪ সালে যখন হাইকোর্ট সেই সিদ্ধান্ত বাতিল করে, তখন সরকার আপিল করেছিল কারণ আমরা কোটা বাতিলের সিদ্ধান্তটি বহাল রাখতে চেয়েছিলাম। আমি ব্যক্তিগত ভাবে ছাত্রদের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নিয়েছিলাম এবং তাঁদের গণভবনে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম। তিন জন মন্ত্রীও তাঁদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। তাঁদের যুক্তিসঙ্গত দাবিগুলো মেনে নেওয়া হয়েছিল। আমরা বলেছিলাম, প্রয়োজনে আইনের মাধ্যমে স্থায়ী সমাধান করা যেতে পারে। আমরা সংলাপ বেছে নিয়েছিলাম। আমরা ধৈর্য বেছে নিয়েছিলাম। আমরা একটি শান্তিপূর্ণ পথ বেছে নিয়েছিলাম। কিন্তু এই আন্দোলনের কোনও দৃশ্যমান বা দায়িত্বশীল নেতৃত্ব ছিল না। যখনই আলোচনা এগোত, অদৃশ্য স্থান থেকে নতুন নতুন নির্দেশনা আসত। দাবিগুলো পরিবর্তন হয়ে যেত। একটি কোটা সংস্কার আন্দোলনকে আমার পদত্যাগের এক দফা দাবিতে পরিণত করা হয়। পরিকল্পিতভাবে মিথ্যা অপপ্রচার চালানো হয়। প্রকৃত ছাত্রদের আবেগ নিয়ে খেলা করা হয়েছে, আর সংগঠিত গোষ্ঠীগুলো তাদের আন্দোলনকে সহিংসতা ও সরকার পতনের আড়াল হিসেবে ব্যবহার করেছে।
পরে ড. মুহাম্মদ ইউনূস নিজেই বলেছিলেন যে, এটি ছিল একটি ‘মাস্টারমাইন্ড’-এর নেতৃত্বে ‘সূক্ষ্মভাবে পরিকল্পিত’ একটি আন্দোলন। তাঁর নিজের মুখ থেকেই সত্য বেরিয়ে এসেছে। এটি কোনও সাধারণ বা স্বতঃস্ফূর্ত ছাত্র আন্দোলন ছিল না। এটি ছিল সংঘটিত, পরিচালিত এবং ব্যালট বাক্সের বাইরে ক্ষমতার পথ তৈরি করার জন্য ব্যবহৃত একটি পরিকল্পনা।
১৫ জুলাই থেকে আন্দোলনের চরিত্র বদলে যায়। হত্যাকাণ্ড, অগ্নিসংযোগ, হামলা ও লুটপাট শুরু হয়। রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংস করা হয়। বাংলাদেশ টেলিভিশনে হামলা চালিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। সেতু, ভবন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, ইপিআই টিকাদান কর্মসূচির ভবন, ফার্মগেট মেট্রোরেল স্টেশন, হানিফ ফ্লাইওভার, মহাখালি এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, বৈজ্ঞানিক গবেষণা কেন্দ্র, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কার্যালয়, জাতীয় ডেটাবেস সেন্টার, কোভিড-১৯ ডেডিকেটেড হাসপাতাল, ঢাকা মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়, আবাসিক হোটেল, শিল্প প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং নরসিংদি জেলা কারাগার-সহ বিভিন্ন কারাগারে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়।
সারাদেশে আওয়ামি লিগের কার্যালয়ে ভাঙচুর চালানো হয়। নেতা-কর্মীদের উপরে হামলা ও হত্যা করা হয়। আমার সরকারের সঙ্গে যুক্ত মন্ত্রী ও শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিবর্গের ঘরবাড়িতে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। গণমাধ্যমকেও লক্ষ্যবস্তু করা হয়। প্রায় ৫০টি মিডিয়া সেন্টার, বেসরকারি টেলিভিশন স্টেশন এবং সংবাদপত্রের কার্যালয়ে হামলা বা অগ্নিসংযোগ করা হয়। চিকিৎসাধীন বা কর্মরত অবস্থায় অনেক সাংবাদিক নিহত হন—যাঁদের মধ্যে মো. শাকিল হোসেন, মেহেদী হাসান, তাহির জামান প্রিয়, এটিএম তুরার, প্রদীপ কুমার ভৌমিক এবং সোহেল আকঞ্জি অন্যতম। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপর সংগঠিত হামলা চালানো হয়। কর্মকর্তাদের হত্যা করা হয়। ফ্লাইওভার থেকে লাশ ঝুলিয়ে রাখা হয়। প্রায় ৪৬০টি থানা ও পুলিশ ফাঁড়িতে আগুন দেওয়া হয়। সদস্যরা ভবনের ভেতরে আটকে পড়েন। অস্ত্র লুট করা হয়। পিটিয়ে কর্মকর্তাদের হত্যা করা হয়। নির্যাতিত পুলিশ সদস্যদের তথ্য মতে, অন্তত ৩,০০০ সদস্য নিহত, আক্রান্ত, নির্যাতিত বা চরম সহিংসতার শিকার হয়েছেন।
তাই আমি একটি সহজ প্রশ্ন করি। এই পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব কী? যখন থানায় আগুন দেওয়া হয়, সরকারি ভবনে হামলা চালানো হয়, পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার ধ্বংস করা হয়, কর্মকর্তাদের হত্যা করা হয় এবং অস্ত্র লুট করা হয়, তখন কি জীবনের নিরাপত্তা ও সম্পত্তি রক্ষার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের কোনও দায়িত্ব থাকে না? প্রতিটি দেশেই নাগরিকদের নিরাপত্তা দেওয়া, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও নিজেদের জীবন রক্ষা করার দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। সেটি কোনও অপরাধ নয়। সেটি আইনের দ্বারা তাঁদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব।
একই সঙ্গে, আমি চেয়েছিলাম সত্যটি প্রকাশিত হোক। সে কারণেই আমি ১৮ জুলাই একটি বিভাগীয়/বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করেছিলাম। এর উদ্দেশ্য স্পষ্ট ছিল: প্রতিটি নিহতের ঘটনার তদন্ত করতে হবে, প্রতিটি সহিংসতার ঘটনা পরীক্ষা করতে হবে এবং প্রতিটি পরিবারের সত্য জানার অধিকার আছে। আমি ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর সঙ্গে দেখা করেছি, আহতদের দেখতে গিয়েছি এবং কর্তৃপক্ষকে সর্বোচ্চ স্তরের চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছি। ১ অগস্ট, তদন্তকে আরও বিস্তৃত, বিশ্বাসযোগ্য এবং পূর্ণাঙ্গ করতে আমি এটিকে তিন সদস্যের কমিশনে উন্নীত করি।
কিন্তু ক্ষমতা দখলের পর, মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অবৈধ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সেই তদন্ত বন্ধ করে দেয়। তারা সত্য বের হতে দেয়নি। যারা হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিল, তারা তাদের দায়মুক্তি (ইন্ডেমনিটি) দিয়েছে। তারা যদি সত্যিই বিচার চাইত, তবে তদন্ত বন্ধ করল কেন? যদি তাদের লুকোনোর কিছু না থাকত, তবে হত্যাকারীদের রক্ষা করল কেন? এই একটি সিদ্ধান্তই আসল সত্য প্রকাশ করে। তারা বিচার চায়নি। তারা ক্ষমতা চেয়েছিল। তারা তদন্ত চায়নি। তারা প্রমাণগুলো মাটি চাপা দিতে চেয়েছিল।
তাদের নিজস্ব বক্তব্যই সত্য ফাঁস করে দিয়েছে। এনসিপির এক নেতা বলেছিলেন, পুলিশ হত্যা না করলে আর মেট্রোরেলে আগুন না দিলে এই ‘বিপ্লব’ সফল হতো না। সিরাজগঞ্জের এক বিএনপি নেতাও প্রকাশ্যে বলেছেন যে আন্দোলন সফল করতেই এনায়েতপুর থানায় আগুন দেওয়া হয়েছিল এবং পুলিশ সদস্যদের হত্যা করা হয়েছিল। এসব বক্তব্য প্রমাণ করে যে জুলাই-অগস্টের আন্দোলন কেবল কোটা সংস্কার আন্দোলন ছিল না। এটি অদৃশ্য নির্দেশ, সংগঠিত সহিংসতা ও অপপ্রচারের মাধ্যমে সাংবিধানিক ব্যবস্থার উপরে একটি সমন্বিত আক্রমণ হয়ে উঠেছিল।
এই ষড়যন্ত্র ৫ অগস্টেই শেষ হয়ে যায়নি। ৫ অগস্টের পরে, সহিংসতা রাজনৈতিক নিপীড়নের একটি প্রচারণায় পরিণত হয়। ১৬ জুলাই ঢাকা কলেজের ছাত্র ও ছাত্রলিগ কর্মী সবুজ আলির হত্যার মাধ্যমে যে হত্যাকাণ্ড শুরু হয়েছিল, তা থামেনি। আওয়ামি লিগের নেতা-কর্মীদের হত্যা করা হচ্ছে, গুম করা হচ্ছে, গ্রেপ্তার করা হচ্ছে, ঘরবাড়ি থেকে বিতাড়িত করা হচ্ছে এবং মিথ্যা মামলায় জর্জরিত করা হচ্ছে। গত দুই বছরে অন্তত ১০,০০০ মানুষ নিহত বা নিখোঁজ হয়েছেন। প্রায় ৬,৫০,০০০ মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রায় ৩,৫০০ মামলা দায়ের করা হয়েছে, যেখানে প্রায় ৪,৫০,০০০ নেতা-কর্মী ও সমর্থককে আসামি করা হয়েছে। আরও ১০,০০,০০০-এর বেশি মানুষকে অজ্ঞাত আসামি হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। ছাত্রলিগ, যুবলিগ ও অন্যান্য সহযোগী সংগঠনের নারী কর্মীরা হেফাজতে নির্যাতন, অপমান ও লাঞ্ছনার শিকার হচ্ছেন। বহু নেতা-কর্মী কারাগারে মারা গিয়েছেন—যেখানে নির্যাতন, চিকিৎসা না দেওয়া, খাবার না দেওয়া, অবহেলা ও মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করার নথিভুক্ত বিবরণ রয়েছে।
এই নিপীড়ন কেবল আওয়ামি লিগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্য, বিচারক, আইনজীবী, বুদ্ধিজীবী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, সাংবাদিক, পেশাজীবী, শ্রমিক, কৃষক এবং সাধারণ নাগরিকরা হামলার শিকার হয়েছেন, গ্রেপ্তার হয়েছেন বা হত্যা মামলায় আসামি হয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষে দাঁড়ানো কোনও মানুষই আজ নিরাপদ নন। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রতীক ও স্মারকচিহ্নগুলো ধ্বংস করা হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধাদের জুতোর মালা দিয়ে অপমান করা হয়েছে। ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে অবস্থিত জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক বাসভবনটি ধাপে ধাপে আক্রমণ ও গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
এটি কোনও এলোমেলো বা আকস্মিক সহিংসতা নয়। এটি বাংলাদেশ থেকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে মুছে ফেলার এক চেষ্টা। ড. মুহাম্মদ ইউনূস নিজেই দেশের পূর্বের ইতিহাস মুছে ফেলার জন্য একটি ‘রিসেট বোতাম’ চাপার কথা বলেছিলেন। তারা মুক্তিযুদ্ধকে মুছে ফেলতে চায়। তারা বঙ্গবন্ধুকে মুছে ফেলতে চায়। যে ভিত্তির ওপর বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল, তারা তার বিরুদ্ধে গিয়ে বাংলাদেশকে নতুন করে লিখতে চায়। দণ্ডপ্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধীদের মুক্তি দেওয়া হয়েছে। জঙ্গি ও শীর্ষ সন্ত্রাসীদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এমনকি একটি সাজানো নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপিকে ক্ষমতায় আনার পরেও পরিস্থিতির কোনও পরিবর্তন হয়নি। বাংলাদেশ এখনও আতঙ্ক, সন্ত্রাস, দমন-পীড়ন, অর্থনৈতিক কষ্ট ও চরম অনিশ্চয়তার কবলে আটকা পড়ে আছে।
এখন দেশের পরিস্থিতির দিকে তাকান। আমরা যে অগ্রগতি অর্জন করেছিলাম তা ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, আর সাধারণ মানুষকে তার খেসারত দিতে হচ্ছে। আওয়ামি লিগের আমলের ৬.৮০ শতাংশের তুলনায় বর্তমানে জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে ২.২২ শতাংশে নেমে এসেছে। শিল্প উৎপাদন ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে। ৫৪ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো শিল্প খাত ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধির মুখে পড়েছে। ব্যাঙ্কিং খাতে খেলাপি ঋণ ১৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪৭ শতাংশে পৌঁছেছে বলে জানা গিয়েছে। দারিদ্র্য ১৮.৬০ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪৬.৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বিনিয়োগ ঋণাত্মক হয়ে পড়েছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। দুই কোটিরও বেশি মানুষ নতুন করে বেকার হয়ে পড়েছে। ৫০০টিরও বেশি শিল্প কারখানা বন্ধ হয়ে গিয়েছে। শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীদের অর্ধেকেরও বেশি হয় কারাগারে, না হয় আত্মগোপনে থাকতে বাধ্য হয়েছেন। সরকার প্রতিদিন ব্যাঙ্ক থেকে ৭০০ থেকে ৯০০ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে চলছে। প্রকল্পের ব্যয় ৫০ শতাংশ থেকে ২৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। একই সাথে জঙ্গিবাদ বৃদ্ধি পাচ্ছে, নারী ও শিশুরা নির্যাতন, ধর্ষণ ও অপমানের শিকার হচ্ছে এবং সাধারণ মানুষ নিজেদের জীবনে নিরাপদ বোধ করছে না। চাঁদাবাজি, খুন ও অপহরণ নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে। এগুলো কেবল কোনও সংখ্যা বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এগুলোর পিছনে রয়েছে একটি পরিবার, একজন শ্রমিক, একজন কৃষক, একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, একজন মা যিনি তাঁর সন্তানের জন্য খাবার কিনতে পারছেন না, এবং একজন তরুণ যিনি আর কোনও আশার আলো দেখতে পাচ্ছেন না।
তবে বাংলাদেশ কী অর্জন করেছিল, আমি আপনাদের তাও স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। জনগণের কল্যাণই সবসময় আমার রাজনীতির মূল উদ্দেশ্য ছিল। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সেই আদর্শের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন এবং আমি সম্পূর্ণ নিষ্ঠার সঙ্গে সেই আদর্শ বহন করেছি। আমাদের উন্নয়ন প্রকল্পগুলো কোনও অহঙ্কারের প্রকল্প ছিল না। সেগুলো ছিল জাতীয় সক্ষমতা গড়ে তোলার অংশ। আমাদের সামাজিক কর্মসূচিগুলো কোনও দয়া ছিল না। সেগুলো ছিল মানবেতর জীবন থেকে মানুষের মর্যাদায় বিনিয়োগ। আমরা বাংলাদেশকে বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড় করিয়েছিলাম। আমরা একে এশিয়ার উদীয়মান টাইগার হিসেবে পরিচিত করেছিলাম।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমার পাঁচটি মেয়াদে, আমরা বাংলাদেশকে একটি শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা, সঠিক আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং সুশৃঙ্খল বাস্তবায়ন ব্যবহার করেছিলাম। ২০০৮ সালের পর, ১৬ বছর ধরে টানা চার মেয়াদে আমরা পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্র বন্দর, কর্ণফুলী টানেল এবং বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের মতো বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছি। আমরা জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬.৫ শতাংশ থেকে ৭.৫ শতাংশের মধ্যে বজায় রেখেছি। আমরা অর্থনীতিকে ৭০ বিলিয়ন ডলার থেকে ৪৫০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করেছি। মাথাপিছু আয় ৪৮২ ডলার থেকে বেড়ে ২,৭৮৪ ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ। দারিদ্র্য ৪১ শতাংশ থেকে কমে ১৮.৭ শতাংশে নেমে এসেছে। চরম দারিদ্র্য ২৫.১ শতাংশ থেকে কমে ৫.৬ শতাংশে নেমে এসেছে। আমরা প্রতিটি নাগরিকের কাছে বিদ্যুৎ পৌঁছে দিয়েছি এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ৩,৭৮২ মেগাওয়াট থেকে বাড়িয়ে ২৮,৫৬৩ মেগাওয়াট করেছি।
আমরা প্রায় ১৪,০০০ কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন করেছি যাতে গ্রামীণ ও প্রান্তিক মানুষ বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা এবং ৩০ ধরনের ওষুধ পেতে পারে। মাতৃমৃত্যুর হার প্রতি লাখে ৩৭০ থেকে কমে ১৮৪-তে নেমে এসেছে। শিশুমৃত্যুর হার ৮৪ থেকে কমে ২১-এ নেমে এসেছে। নিরাপদ খাবার, পানির সুবিধা ৯৮ শতাংশে পৌঁছেছে। স্যানিটারি ল্যাট্রিন ব্যবহার ৯৭ শতাংশে পৌঁছেছে। মানুষের গড় আয়ু ৫৯ বছর থেকে বেড়ে ৭৩ বছর হয়েছে। আমরা ৮.৪৫ লাখ ভূমিহীন পরিবারকে দুই কাঠা জমি, একটি সেমি-পাকা ঘর এবং জীবিকার সংস্থান করে দিয়েছি। অন্তত ৪৫ লাখ মানুষ থাকার জায়গা পেয়েছেন। ১৪৫টি সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচির মাধ্যমে প্রায় দশ কোটি মানুষ বিভিন্ন ধরনের ভাতা ও সহায়তা পেয়েছেন।
আর যখন মায়ানমারে নির্যাতন ও সহিংসতার শিকার হয়ে দশ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে এসেছিল, তখন বাংলাদেশ মানবিক কারণে তার দরজা খুলে দিয়েছিল। বাংলাদেশ নিজে একটি ঘনবসতিপূর্ণ উন্নয়নশীল দেশ হওয়া সত্ত্বেও আমরা তাদের আশ্রয়, খাদ্য, চিকিৎসা সেবা ও নিরাপত্তা দিয়েছি। আমরা এটি করেছি কারণ মানবতা এটি দাবি করেছিল।
তাই আজ আমি তাদের কাছে একটি সহজ প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করি যারা আমার চলে যাওয়া উদযাপন করেছিল: আপনারা আসলে কী পেলেন? আপনারা কি গণতন্ত্র পেয়েছেন? আপনারা কি নিরাপত্তা পেয়েছেন? আপনারা কি বাকস্বাধীনতা পেয়েছেন? জিনিসপত্রের দাম কি কমেছে? সাধারণ পরিবারগুলো কি নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে পারছে? মানুষ কি নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি ও বিদ্যুৎ পাচ্ছে? অর্থনীতি কি শক্তিশালী হয়েছে? গত দুই বছরে কি আপনারা বিন্দুমাত্র উন্নয়ন দেখেছেন? নারীরা কি নিরাপদ? শিশুরা কি নিরাপদ? সংখ্যালঘুরা কি নিরাপদ? সাংবাদিক, শিক্ষক, শিল্পী ও বুদ্ধিজীবীরা কি নিরাপদ? বাংলাদেশ সমৃদ্ধি, মর্যাদা ও আত্মবিশ্বাসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। আগস্ট ২০২৪-এর পর, এটিকে ভয়, প্রতিশোধ, কষ্ট ও অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।
আমি বাংলাদেশের তরুণদের উদ্দেশেও সরাসরি কিছু বলতে চাই। আপনাদের শক্তিকে ধ্বংসের হাতিয়ার হিসেবে কাউকে ব্যবহার করতে দেবেন না। প্রশ্ন তুলুন। দাবি তুলুন। অন্যায় দেখলে প্রতিবাদ করুন। সেটি আপনাদের অধিকার। কিন্তু নিজেদের চোখে সত্যকে দেখুন। বুঝতে চেষ্টা করুন কে আপনাদের ভবিষ্যৎ গড়তে চায়, আর কে আপনাদের ক্ষোভকে ক্ষমতার সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করতে চায়। চরমপন্থা বা প্রতিশোধের রাজনীতির হাতিয়ার হবেন না।
বাংলাদেশকে জ্ঞান, প্রযুক্তি, দক্ষতা ও মানবতা দিয়ে গড়ে তুলতে হবে। ধ্বংসের মাধ্যমে কোনো রাষ্ট্র গড়ে ওঠে না। কঠোর পরিশ্রম, শৃঙ্খলা ও দায়িত্ববোধের মাধ্যমে এটি গড়ে ওঠে। ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের ঊর্ধ্বে উঠে দেখুন। দেশের বাস্তবতার দিকে তাকান। বাংলাদেশকে বাঁচাতে হলে গণতন্ত্র, আইনের শাসন এবং জনগণের অধিকার ফিরিয়ে আনতে হবে। বাংলাদেশের তরুণদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে দায়িত্বশীলতার সঙ্গে এই সংগ্রামে অংশ নিতে হবে। তোমরাই আমাদের দেশের ভবিষ্যৎ।
আমি বিশ্বাস করি বাংলাদেশের জাতীয় ঐক্যের (Reconciliation) প্রয়োজন রয়েছে। দেশের ক্ষতের উপশম প্রয়োজন। কিন্তু ঐক্যের অর্থ কখনো বিচারহীনতা (Impunity) হতে পারে না। যারা দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছে, অপরাধ করেছে এবং মানুষের কষ্টের কারণ হয়েছে, তাদের সঠিক আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। ভুক্তভোগীদের আইনি সুরক্ষা এবং যথোপযুক্ত ক্ষতিপূরণ পেতে হবে।
বাংলাদেশের এই সঙ্কট কেবল কোনও অভ্যন্তরীণ সঙ্কট নয়। এটি আঞ্চলিক শান্তি, নিরাপত্তা, বাণিজ্য, উন্নয়ন ও মানবমর্যাদাকে প্রভাবিত করে। সে কারণেই আমি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং বাংলাদেশের সকল বন্ধুভাবাপন্ন দেশকে আহ্বান জানাই যেন তারা গণতন্ত্র, বিচার ও শান্তির জন্য বাংলাদেশের মানুষের এই সংগ্রামে পাশে দাঁড়ায়। একটি স্থিতিশীল বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার জন্য, বঙ্গোপসাগরের জন্য, উন্নয়ন সহযোগীদের জন্য এবং গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও বিচারে বিশ্বাসী সকল দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আগামী দশকটি পুনরুদ্ধার ও পুনর্জাগরণের দশক হতে পারে, তবে তা কেবল তখনই সম্ভব যদি গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করা হয় এবং জনগণকে তাদের নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের সুযোগ দেওয়া হয়।
সেই কারণেই আমি স্পষ্টভাবে এই দাবিগুলো তুলে ধরছি। আওয়ামি লিগের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে। রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি দিতে হবে। মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করতে হবে। বাকস্বাধীনতা ফিরিয়ে দিতে হবে। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা রক্ষা করতে হবে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জনগণের সেবা করতে হবে, তাদের নয় যারা প্রতিশোধের জন্য ক্ষমতা ব্যবহার করে। এগুলো কোনো একক দলের দাবি নয়। বাংলাদেশকে বাঁচানোর জন্য এগুলো অপরিহার্য পদক্ষেপ।
আমার কপালে যা-ই ঘটুক না কেন, আমি আমার মানুষের কাছে ফিরে যাব। আমার প্রিয় দেশবাসী যখন কষ্টে আছে, তখন আমি দূরে থাকতে পারি না। আমি জানি আমাকে আটক করা হতে পারে। আমাকে কারাগারে পাঠানো হতে পারে। ভিত্তিহীন মামলায় দেওয়া রায়গুলো কার্যকর করার চেষ্টা তারা করতে পারে। কিন্তু ভয় জনগণের প্রতি আমার দায়িত্ব নির্ধারণ করতে পারে না। আমার জীবন অনেক আগেই ব্যক্তিগত নিরাপত্তার হিসাব-নিকাশের ঊর্ধ্বে চলে গেছে। ১৯৭৫ সালে আমি আমার পরিবারকে হারিয়েছি। ছয় বছর নির্বাসনে কাটিয়েছি। দেশে ফেরার পর সামরিক শাসন, স্বৈরাচার, হত্যাচেষ্টা ও রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াই করেছি। ২০০৪ সালের ২১ অগস্টের গ্রেনেড হামলাও আমাকে থামাতে পারেনি।
আমি আমার নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত নই। আমি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত। আমি ফিরে আসতে চাই কারণ দেশের মানুষ নিরাপত্তা, উন্নয়ন, সমৃদ্ধি ও শান্তি পাওয়ার যোগ্য। তারা এমন একটি রাষ্ট্র পাওয়ার যোগ্য যা তাদের রক্ষা করে, এমন একটি অর্থনীতি পাওয়ার যোগ্য যা তাদের সুযোগ দেয় এবং এমন একটি গণতন্ত্র পাওয়ার যোগ্য যা তাদের অধিকার নিশ্চিত করে। আমার প্রত্যাবর্তন এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় আওয়ামি লিগের প্রত্যাবর্তন কোনও ক্ষমতার জন্য নয়। এটি বাংলাদেশকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার জন্য। দেশের উন্নয়ন, অগ্রগতি, অসাম্প্রদায়িকতা ও স্থিতিশীলতার পথকে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য। আমি একটি উদ্দেশ্য নিয়েই বাংলাদেশে ফিরতে চাই: জনগণের পাশে দাঁড়াতে এবং তাঁদের জীবনের মানোন্নয়নে সহায়তা করতে। জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস। আমি তাঁদের উপর বিশ্বাস রাখি। আমি তাঁদের ওপর আস্থা রাখি। এবং আমি তাঁদের কাছেই ফিরে যাব।
জয় বাংলা। জয় বঙ্গবন্ধু। বাংলাদেশ চিরজীবী হোক।
দেশপক্ষ/ এমএইচ






