ঢাকা, শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬, ৪:০৬ পূর্বাহ্ন

​অবিনাশী মুজিবনগর: ভাস্কর্য ভাঙা যায়, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নয়

১৭ এপ্রিল ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে তৎকালীন মেহেরপুর মহকুমার বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার শপথ গ্রহণ করে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে দিনটি অবিস্মরণীয়।

​১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালি জাতির ওপর হামলা চালানোর পর ১০ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার’ প্রতিষ্ঠা করা হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি, সৈয়দ নজরুল ইসলামকে উপরাষ্ট্রপতি এবং তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী করে প্রথম অস্থায়ী সরকার গঠন করা হয়। এ ছাড়া মন্ত্রী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয় ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী ও এএইচএম কামারুজ্জামানকে। দুর্ভাগ্যবশত বঙ্গবন্ধুর খুনি মোশতাকও যুক্ত হয়েছিল মুজিবনগর সরকারের মন্ত্রিসভায়। এম এ জি ওসমানীকে সরকারের প্রধান সেনাপতি নিযুক্ত করা হয়। ঐতিহাসিক গুরুত্ব অনুধাবন করে বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননের নামকরণ করা হয় ‘মুজিবনগর’।
​মুজিবনগর সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন আবদুল মান্নান (এমএনএ) এবং স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেন অধ্যাপক ইউসুফ আলী (এমএনএ)। মুজিবনগরে তৎকালীন সাব-ডিভিশনাল পুলিশ কর্মকর্তা মাহবুব উদ্দিনের নেতৃত্বে ১২ জন আনসার সদস্য বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামকে ‘গার্ড অব অনার’ প্রদান করেন।

​মুজিবনগর সরকারকে ১৫টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগে ভাগ করা হয়। এ ছাড়া কয়েকটি বিভাগ মন্ত্রিপরিষদের কর্তৃত্বাধীনে থাকে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় যুদ্ধরত অঞ্চলকে ১১টি সেক্টরে বিভক্ত করে প্রতিটিতে একজন করে সেক্টর কমান্ডার নিয়োগ করে।

​এদিকে ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর সরকারের মন্ত্রীরা শপথ নিলেও ১৮ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদের প্রথম সভায় মন্ত্রীদের দপ্তর বণ্টন করা হয়। মুজিবনগর সরকারের সফল নেতৃত্বে নয় মাসের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ বিজয় অর্জনের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা লাভ করে। শুধু তা-ই নয়, স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের এই প্রথম সরকারের কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন। এর আগে ভারত ও ভুটান এই সরকারকে স্বীকৃতি দেয়।
​ঐতিহাসিক মুজিবনগরেই রচিত হয়েছিল স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের ভিত্তি। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু ঘোষিত স্বাধীনতাকে বাস্তবে রূপ দিতে তৎকালীন আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ মুজিবনগরে একত্রিত হয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করার জন্য গঠিত সংগ্রাম কমিটি এবং প্রতিবেশী দেশ ভারতের নিরাপত্তা বাহিনীর সহযোগিতায় এই শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়। সেদিন নবগঠিত বাংলাদেশ সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে হাজির হয়েছিলেন দেশ-বিদেশের বহু বিখ্যাত সাংবাদিক। বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি থাকায় অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম। এই সরকারই ৯ মাসের স্বাধীনতা যুদ্ধ ও মুক্তি সংগ্রামে নেতৃত্ব দেয়। ‘মুজিবনগর সরকার’ হিসেবেও এই সরকারের একটি স্বতন্ত্র পরিচয় রয়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের অনুপস্থিতিতে প্রবাসী ‘মুজিবনগর সরকার’ বহু প্রতিকূল পরিস্থিতির মোকাবিলা করেছিল। তাঁদের সুযোগ্য নেতৃত্বেই জাতি ওই বছরের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি হানাদারদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করে। বিশ্বের বুকে জন্ম নেয় স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ।

​ওই সরকারের সকল কৃতিত্বের সূচনা হয়েছিল মুজিবনগরে শপথ গ্রহণের অনুষ্ঠান থেকে। সেই সরকারের অধীনেই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রশাসন, প্রচারণা, কূটনীতি ও যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধকালে সারাদেশকে কয়েকটি সেক্টরে বিভক্ত করা হয় এবং মুজিবনগর সরকার প্রতিটি সেক্টরের দায়িত্ব দিয়েছিল একেকজন সেক্টর কমান্ডারের হাতে। মুক্তিযুদ্ধকালে সবচেয়ে বেশি সহায়তা দিয়েছিল ভারত। এ ছাড়া সোভিয়েত ইউনিয়নসহ আরও কিছু রাষ্ট্র বিভিন্নভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করে। এই ইতিহাস আজ আর কারো অজানা নয়।

​বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের ভিত্তি এই মুজিবনগরের ইতিহাসকে আগামী প্রজন্ম ও বহিঃবিশ্বে ছড়িয়ে দিতে নানামুখী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছিল বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার। শুরু থেকেই তা মেনে নিতে পারেনি তারা—বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধ শব্দ দুটি শুনলেই যাদের গায়ে কাঁটা বিঁধে; যাদের পূর্বপুরুষ ছিল স্বাধীনতা বিরোধী পাকসেনাদের দোসর। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ষড়যন্ত্রমূলক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুযোগে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরসহ সারা বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা চিরতরে মুছে ফেলতে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিসহ প্রায় সকল মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য ও স্থাপনা ভেঙে ফেলার ধ্বংসলীলায় মেতে ওঠে স্বাধীনতা বিরোধী অপশক্তি ও তাদের প্ররোচনায় একদল পথভ্রষ্ট ছাত্রসমাজ।
​দৈনিক প্রথম আলোসহ বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী, একদিনেই ভেঙে ফেলা হয়েছে ঐতিহাসিক মুজিবনগর শহীদ স্মৃতি কমপ্লেক্সের ছোট-বড় ৬০০টি ভাস্কর্য। সেদিন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়লে শতাধিক দুর্বৃত্ত হানা দেয় মেহেরপুরের মুজিবনগর স্মৃতি কমপ্লেক্সে। তারা মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ভাস্কর্যগুলো ভেঙে ফেলে। ৫ আগস্ট বিকেল পাঁচটায় সেখানে এক চরম তাণ্ডব পরিচালিত হয়।

​প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, ৫ আগস্ট বিকেল পাঁচটার দিকে শতাধিক যুবক রড, বাঁশ ও হাতুড়ি নিয়ে স্মৃতি কমপ্লেক্সে প্রবেশ করে। প্রথমে তারা বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যটির মাথা ভেঙে গুঁড়ো করে ফেলে। একই সময়ে এলোপাতাড়িভাবে আঘাত করে ‘১৭ এপ্রিলের গার্ড অব অনার’ ভাস্কর্যটিতে। আরও একটি দল ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানের আত্মসমর্পণের ভাস্কর্যগুলোতে আঘাত করে। তবে সেখানে খুব বেশি ভাঙচুর করতে পারেনি তারা। পরে কমপ্লেক্সের মধ্যে দেশের মানচিত্রের আদলে তৈরি করা মুক্তিযুদ্ধের ১১টি সেক্টরের যুদ্ধের বর্ণনা সংবলিত ছোট ভাস্কর্যগুলো ভেঙে চারপাশে ছুড়ে ফেলে। আরও একটি দল শহীদ স্মৃতিসৌধের প্রধান ফটকটি ভেঙে নিয়ে যায়।

​মুজিবনগর কমপ্লেক্সের দায়িত্বে থাকা আনসার সদস্য হুমায়ূন আহমেদের ভাষ্যানুযায়ী, ছোট-বড় ৬০০টি ভাস্কর্য ভেঙে ফেলা হয়েছে। পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণ ছিল এই ভাস্কর্যগুলো। প্রতিদিন কয়েক হাজার দর্শনার্থী এখানে আসতেন। কমপ্লেক্সের সব ভাস্কর্য ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে দুর্বৃত্তরা; চালিয়েছে লুটপাট। রাতেও কয়েক দফা হামলা চালানো হয় সেখানে।

​১৯৮৭ সালের ১৭ এপ্রিল উদ্বোধন করা হয় মুজিবনগর স্মৃতিসৌধের। ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই স্থানকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলতে ১৯৯৬ সালে সেখানে মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কমপ্লেক্স স্থাপন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। স্মৃতি কমপ্লেক্সে একটি মানচিত্রের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন সেক্টরকে দেখানো হয়েছিল। কমপ্লেক্সে মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাবলির স্মারক ম্যুরাল স্থাপন করা হয়েছিল। সার্বিকভাবে মুজিবনগর স্মৃতিসৌধ, মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কমপ্লেক্স, ঐতিহাসিক আম্রকানন, ঐতিহাসিক ছয় দফাকে রূপকের মাধ্যমে উপস্থাপনকারী ছয় ধাপের গোলাপ বাগান ছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।

​কোনো কিছুই হুট করে হয় না। মুজিবনগর স্মৃতিসৌধের ওপর এই আক্রোশ ছিল দীর্ঘদিনের। তাদের পূর্বপুরুষরা ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর জেলের অভ্যন্তরে জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করে মুজিবনগর সরকার গঠনের বদলা নিয়েছিল। আর তাদের উত্তরসূরীরা মহান মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতার স্মৃতিবিজড়িত মুজিবনগর স্মৃতি কমপ্লেক্সের সকল স্থাপনা ও ভাস্কর্য গুঁড়িয়ে দিয়ে সেই অসমাপ্ত কাজই সম্পন্ন করতে চেয়েছিল।
​তবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধী অপশক্তিদের এই অপচেষ্টা কোনোদিন সফল হবে না। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতার অবদান কেউ কখনো মুছে ফেলতে পারবে না। বরং যখনই আঘাত আসবে, তাঁদের দেখানো পথেই ঘুরে দাঁড়াবে বাংলাদেশ—নব প্রতিরোধে ও নব প্রতিবাদে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী আপামর জনগোষ্ঠী মনে-প্রাণে বিশ্বাস করে, বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার সাহসী স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে আবার হাসবে বাংলাদেশ; ঘটবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাংলাদেশের পুনর্জাগরণ।

( ​মানিক লাল ঘোষ: সাংবাদিক ও কলামিস্ট; সাবেক সহ সভাপতি, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন।)

-নি/ এমএইচ

নিউজটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

ট্যাগঃ