ঢাকা, মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬, ৩:০৬ অপরাহ্ন

লোডশেডিংয়ে দিশেহারা রাজশাহীর শিক্ষার্থী ও কৃষক

জ্বালানি সঙ্কট ও বিদ্যুৎ উৎপাদন ঘাটতির কারণে রাজশাহী মহানগরীসহ জেলার বিভিন্ন উপজেলায় লোডশেডিং এখন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। শহরে ১ থেকে দেড় ঘণ্টার লোডশেডিং হলেও গ্রামাঞ্চলে তা ৯ থেকে ১৫ ঘণ্টা পর্যন্ত দীর্ঘায়িত হচ্ছে। তীব্র তাপপ্রবাহের মধ্যে বিদ্যুৎহীনতায় জনজীবন দুর্বিষহ হয়ে পড়েছে। এর মধ্যেই আগামী মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) থেকে শুরু হতে যাওয়া এসএসসি পরীক্ষা নিয়ে দেখা দিয়েছে চরম অনিশ্চয়তা।

বিদ্যুতের লুকোচুরিতে পরীক্ষার্থীদের পড়াশোনা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বাড়ছে মশার উপদ্রব। বিদ্যুৎ সঙ্কটের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে কৃষি ও অর্থনীতিতেও। সেচ সঙ্কটে ঝুঁকির মুখে পড়েছে বোরো ধানসহ বিভিন্ন ফসল, আর উৎপাদন বন্ধের উপক্রম ছোট কলকারখানাগুলোতে। এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা করছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী ও কৃষকরা।

ঝুঁকিতে এসএসসি পরীক্ষার্থীদের প্রস্তুতি

আগামী মঙ্গলবার থেকে শুরু হতে যাওয়া এসএসসি পরীক্ষা নিয়ে চরম উৎকণ্ঠায় শিক্ষার্থীরা। চারঘাট পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের এক পরীক্ষার্থী জানায়, ‘শেষ মুহূর্তের রিভিশন খুব জরুরি, কিন্তু পড়তে বসলেই কারেন্ট চলে যায়। এভাবে চললে পরীক্ষা দেয়া কঠিন হয়ে পড়বে।’ সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন অভিভাবকরাও। তারা বলছেন, রাতে বিদ্যুৎ না থাকায় বাচ্চারা ঠিকমতো ঘুমাতেও পারছে না, আবার পড়াশোনাও করতে পারছে না।

এ বিষয়ে চারঘাট পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের ডিজিএম আসাদুজ্জামান এর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, চারঘাটের বিদ্যুৎ এর চাহিদা ১৮ মেগাওয়াট সেখানে পাচ্ছি ১১ মেগাওয়াট ফলে লোডশেডিং দেয়া হচ্ছে। এছাড়া এসএসসি পরীক্ষার্থীদের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, কোন সুযোগ সুবিধা দেয়ার মত এখতিয়ার আমার নেই বলে তিনি জানান।

কৃষি ও শিল্পে স্থবিরতা

বিদ্যুৎ বিভ্রাটের প্রভাব পড়েছে রাজশাহী অঞ্চলের কৃষি ও ব্যবসা খাতেও। তীব্র তাপদাহে সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় বোরো ধানসহ মাঠের ফসল চৌচির হয়ে যাচ্ছে। ছোট ছোট কলকারখানায় উৎপাদন বন্ধ থাকায় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন ব্যবসায়ীরাও। রাজশাহীর নিউ মার্কেট এলাকার ব্যবসায়ী রুবেল সরকার বলেন, ‘সারাদিন কাস্টমারের চাপ থাকে, কিন্তু বিদ্যুৎ না থাকায় কাজ আগাতে পারছি না। কম্পিউটারে কাজ করার সময় হঠাৎ লাইন চলে গেলে ডেটা হারিয়ে যায়, আইপিএস দিয়েও বেশিক্ষণ চলে না। এভাবে চলতে থাকলে দোকান ভাড়াসহ পরিবার চালানো কঠিন হয়ে পড়বে।

সাহেব বাজার এলাকার ব্যবসায়ী ইসমাইল হোসেন বলেন, ‘ফ্রিজে রাখা দুধ, মিষ্টি আর কাঁচামাল গরমে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কাস্টমার এসে গরমের মধ্যে দোকানে বসতে চায় না। জেনারেটর চালালে তেলের যে খরচ হয়, তাতে লাভের বদলে উল্টো লোকসান গুণতে হচ্ছে। ব্যবসা চালানো এখন অসম্ভব হয়ে পড়েছে।’ ব্যবসায়ী নেতা সেকেন্দার আলী জানান, ‘লোডশেডিংয়ের কারণে বাজারের স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। বিদ্যুৎ সঙ্কটের স্থায়ী সমাধান না হলে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা পথে বসা শুরু করবে।’

একই অবস্থা কৃষিতেও। নাচোল উপজেলার নেজামপুর ইউনিয়নের কৃষক মাসুদ রানা বলেন, ‘এখন বোরো ধানের গুরুত্বপূর্ণ সময়। জমিতে নিয়মিত পানি না দিলে ফলন কমে যাবে। কিন্তু বিদ্যুৎ না থাকায় পাম্প চালানো যাচ্ছে না। কয়েক দিন ধরে বিদ্যুৎ আসে আর যায়, এভাবে চাষাবাদ চালানো খুব কঠিন হয়ে পড়েছে।’ তানোর পৌর এলাকার বাসিন্দা মিনারুল, খাইরুল, রাজা, হাবিবুর, লিটন ও ওমর ফারুক, গত এক সপ্তাহ ধরে দিনে-রাতে মিলিয়ে ১০ থেকে ১২ বার পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। একবার বিদ্যুৎ গেলে এক ঘণ্টার আগে ফেরে না।

কৃষক আজহার, মনসুর ও মামুন মোল্লা জানান, বিল এলাকার ইরি-বোরো ধান কাটার সময় ঘনিয়ে এলেও সেচ সঙ্কটে তারা দুশ্চিন্তায় আছেন। বিশেষ করে আলু জমির বোরো ও আউশ ধানের জন্য সেচ জরুরি হলেও বিদ্যুৎ না থাকায় তা সম্ভব হচ্ছে না। ভোল্টেজ ওঠানামার কারণে সেচযন্ত্রও নষ্ট হচ্ছে।

কর্মকর্তাদের ভিন্ন দাবি

এদিকে, মাঠপর্যায়ে লোডশেডিংয়ে জনজীবন স্থবির হয়ে পড়লেও বিদ্যুৎ বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বক্তব্যে পাওয়া গেছে ভিন্ন চিত্র। রাজশাহী নেসকো এবং পল্লী বিদ্যুতের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ‘অধিক’ লোডশেডিংয়ের বিষয়টি মানতে নারাজ। তাদের দাবি, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং লোডশেডিংয়ের পরিমাণ অত্যন্ত সামান্য।

নেসকো রাজশাহী কার্যালয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মশিউর রহমান গণমাধ্যমকে জানান, বর্তমানে রাজশাহীতে বিদ্যুতের মোট চাহিদা ৪৭০ মেগাওয়াট। তিনি দাবি করেন, ‘চাহিদা মিটিয়েও আমাদের কাছে ১৬-১৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ অবশিষ্ট থাকছে। ফলে লোডশেডিং হওয়ার কথা নয়, যা হচ্ছে তা খুবই সামান্য সময়ের জন্য। আমরা গ্রাহকদের নিরবচ্ছিন্ন সেবা দিতে কাজ করে যাচ্ছি।’

অন্যদিকে, রাজশাহী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার রমেন্দ্র চন্দ্র রায় লোডশেডিংয়ের কথা স্বীকার করলেও তা ‘অল্প’ বলে দাবি করেন। তিনি বলেন, ‘রাজশাহীতে পল্লী বিদ্যুতের ১০০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে বর্তমানে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ লোডশেডিং চলছে। এটি একটি সাময়িক সমস্যা, আশা করছি দ্রুতই লোডশেডিং কমে আসবে।’

নাটোর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২ (বাঘা জোনাল অফিস) এর ডিজিএম মনিরুল ইসলাম বিদ্যুতের সুষম বণ্টনের ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি জানান, তার আওতাধীন আড়ানী, জোতরাঘব ও চকরাজাপুর উপকেন্দ্রের ১৫টি ফিডার লাইনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। যতটুকু বরাদ্দ পাওয়া যায়, তা পর্যায়ক্রমে এই ফিডারগুলোর মাধ্যমে গ্রাহকদের মাঝে ভাগ করে দেয়া হচ্ছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তাদের এমন আশ্বাসের বিপরীতে বাস্তব চিত্র কবে নাগাদ স্বাভাবিক হবে- সেই অপেক্ষায় প্রহর গুণছে রাজশাহীর সাধারণ মানুষ ও আসন্ন এসএসসি পরীক্ষার্থীরা।

দেশপক্ষ/ এমএইচ

নিউজটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

ট্যাগঃ