
মাত্র দুই মাসে প্রায় দুই লাখের বেশি ক্রেডিট কার্ড কমে গেছে, যা ব্যাংকিং খাতে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, একদিকে কার্ডসংখ্যা কমে যাওয়া গ্রাহকদের সতর্কতা ও ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার প্রতিফলন। একই সঙ্গে উচ্চ সুদের হার ও অর্থনৈতিক চাপও অনেক গ্রাহককে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার থেকে দূরে রাখছে।
সূত্রটি জানায়, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে দেশে মোট ক্রেডিট কার্ডের সংখ্যা ছিল ২৯ লাখ এক হাজার ৪৯০টি। কিন্তু ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২৭ লাখ এক হাজার ১৯২টিতে। অর্থাৎ দুই মাসে কমেছে দুই লাখ ২৯৮টি কার্ড।
এর আগে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে দেশে ক্রেডিট কার্ডের সংখ্যা ছিল ২৬ লাখ ৭৪ হাজার ৫১২টি। সে হিসাবে এক বছরে কার্ডের সংখ্যা বাড়লেও সাম্প্রতিক সময়ে হঠাৎ এই বড় পতন ভিন্ন বার্তা দিচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
এ প্রসঙ্গে তৌহিদুল আলম বলেন, দেশের অর্থনীতির সঙ্গে কার্ড লেনদেনের একটি নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে এবং সেই অনুযায়ীই লেনদেন ওঠানামা করে। তিনি জানান, ফেব্রুয়ারি মাস ছিল রোজা শুরুর সময়, যখন সাধারণত ব্যবসা কিছুটা ধীরগতিতে থাকে। ১০ রোজার পর থেকে কেনাকাটা বাড়তে শুরু করে এবং ব্যাংকগুলোও বিভিন্ন অফার ও প্রচারণা জোরদার করে, যার প্রভাব মার্চের পরিসংখ্যানে দেখা যেতে পারে।
তিনি আরো বলেন, ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনকেও লেনদেন কমার একটি কারণ হিসেবে দেখা যায়। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, ফলে কার্ড ব্যবহার কমে যেতে পারে। পাশাপাশি দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও ঋণের উচ্চ সুদের হারও গ্রাহকদের ব্যয় আচরণে প্রভাব ফেলেছে।
তবে বিপরীত চিত্রও রয়েছে কার্ড ব্যবহারের সামগ্রিক প্রবণতায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের পাঁচ বছরভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দেশে ক্রেডিট, ডেবিট ও প্রি-পেইড কার্ড ব্যবহারে বড় ধরনের প্রবৃদ্ধি হয়েছে।
গত পাঁচ বছরে কার্ড ইস্যু বেড়েছে প্রায় ১০৫ শতাংশ এবং মোট লেনদেন বেড়েছে প্রায় ১০০ শতাংশ, যা ডিজিটাল লেনদেনের দ্রুত বিস্তারকে নির্দেশ করে। সাম্প্রতিক সময়ের পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে দেশে অভ্যন্তরীণ ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার বেড়েছে ১৫.৩০ শতাংশ। তবে একই সময়ে দেশের বাইরে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার কমেছে ১.৭৫ শতাংশ এবং বাংলাদেশে বিদেশিদের কার্ড ব্যয়ও কমেছে ০.৫৫ শতাংশ। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে দেশের অভ্যন্তরে ক্রেডিট কার্ডের প্রায় অর্ধেক লেনদেনই হয়েছে ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে, যা খুচরা কেনাকাটায় ভোক্তাদের ঝোঁককে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
অন্যদিকে বিদেশে কার্ড ব্যবহারে উল্লেখযোগ্য অঙ্কের অর্থ ব্যয় হয়েছে। ওই মাসে ক্রেডিট কার্ডে বিদেশে লেনদেন হয়েছে প্রায় ৩৭৭ কোটি ১০ লাখ টাকা, ডেবিট কার্ডে ২৭৯ কোটি ৮০ লাখ টাকা এবং প্রি-পেইড কার্ডে প্রায় ৪০ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিদেশে তিন ধরনের কার্ডে মোট খরচ হয়েছে প্রায় ৬৯৭ কোটি টাকা। বিপরীতে একই সময় বিদেশ থেকে বাংলাদেশে কার্ডের মাধ্যমে এসেছে প্রায় ২৬৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ বিদেশে বাংলাদেশিদের ব্যয় বিদেশিদের দেশের ভেতরে ব্যয়ের তুলনায় প্রায় ২.৬১ গুণ বেশি।
এদিকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৪৮টি তফসিলি ব্যাংক ও একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ক্রেডিট কার্ডে মোট অনুমোদিত ঋণসীমা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪১ হাজার ৮২৯ কোটি টাকা। এর বিপরীতে গ্রাহকদের কাছে বকেয়া রয়েছে প্রায় ১৪ হাজার ৪২৯ কোটি টাকা।








